রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় আলুর দাম ধস ও সংরক্ষণ সংকটে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। হিমাগারে সংরক্ষণের খরচ বেশি হওয়ায় অনেকেই ঘরে আলু রাখছেন, তবে টানা বৃষ্টি ও আর্দ্রতার কারণে সেই আলু দ্রুত পচে নষ্ট হচ্ছে।
‘এক কেজি আলুতে খরচ পড়েছে ১৮ টাকা। অথচ পাইকাররা দেয় পাঁচ টাকা। হিমাগারে রাখলে আবার খরচ বেশি, তাই ঘরেই রেখেছি। ৮০ বস্তা আলু একবারে পচে শেষ, তাই রাস্তার পাশে ফেলে দিয়েছি। এ আলু আমাকে একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছে’—কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন গঙ্গাচড়ার কুড়িয়ার মোড় এলাকার কৃষক মিজানুর।
তিনি বলেন, ‘জমি-জমা নেই, অন্যের জমি বর্গা নিয়ে আবাদ করেছি। সে আলু লাগিয়েছি লাভের আশায়। লাভ তো দূরের কথা, বর্গার টাকাই তুলতে পারিনি। রাস্তায় ফেলে দেওয়ার সময় মনে হচ্ছিল বুকটা ফেটে যায়। এত কষ্টের আবাদ এভাবে নষ্ট হবে কখনও ভাবিনি।’
শুধু মিজানুরই নন, উপজেলার চেংমারী ও কুড়িয়ার মোড় এলাকার প্রায় ২০০ কৃষকের একই অবস্থা। সোমবার (৫ ডিসেম্বর) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন সড়কের পাশে শত শত বস্তাভর্তি পচা আলু ফেলে রাখা হয়েছে। কোথাও কোথাও এসব আলু স্তূপ করে রাখা হয়েছে, যা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারে দাম পড়ে যাওয়ায় আলু বিক্রি করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে সংরক্ষণের অভাবে আলু পচে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে সেগুলো ফেলে দিতে হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর গঙ্গাচড়ায় ৫ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। এতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ২০৭ টন, যা স্থানীয় চাহিদার তুলনায় বেশি। তবে আগাম বৃষ্টিতে প্রায় ৬০ হেক্টর জমির আলু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অতিরিক্ত উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতার কারণে আলুর দাম কমে গেছে। বর্তমানে পাইকারি বাজারে আলুর দর ৬ থেকে ৭ টাকা কেজি হলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকের কাছ থেকে কেনা হচ্ছে ৪ থেকে ৫ টাকায়। অথচ উৎপাদন খরচ প্রতি কেজিতে ১৮ থেকে ১৯ টাকা। ফলে প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
উপজেলায় একমাত্র হিমাগারের ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার বস্তা, যা ইতোমধ্যে প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে অনেক কৃষক বাড়িতে আলু সংরক্ষণ করতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু আবহাওয়ার কারণে এসব আলু দ্রুত পচে যাচ্ছে।
চেংমারী গ্রামের কৃষক চান মিয়া জানান, তিনি নিজের ও বর্গা নেওয়া জমিসহ প্রায় ৩ একর জমিতে আলু চাষ করেছেন। সার ও কীটনাশক বাকিতে নিয়ে আবাদ করলেও ভালো ফলন পেয়েছেন। কিন্তু পাইকার না পাওয়ায় কিছু আলু হিমাগারে রাখেন এবং প্রায় ২০০ বস্তা বাড়িতে সংরক্ষণ করেন। পরে বৃষ্টির কারণে সেগুলো পচে যায়।
গঙ্গাচড়া এমএনটি হিমাগারের সামনে নবনীদাস এলাকার আলু ব্যবসায়ী মানিক মিয়া বলেন, মাঠে পাঁচ টাকা কেজিতে আলু কিনলেও বস্তা, শ্রমিক, পরিবহন ও সংরক্ষণসহ খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২০ টাকা। অথচ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৭ থেকে ৮ টাকায়। এতে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবেল হুসেন বলেন, ‘যারা শুরুতে আলু তুলেছেন তারা ক্ষতির মুখে পড়েননি। কিন্তু দেরিতে তোলা আলু বৃষ্টি ও সংরক্ষণ সমস্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আবহাওয়ার অস্থিরতা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এ পরিস্থিতির মূল কারণ।’
সিএ/এমই


