ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে ইমামুল হারামাইন আল-জুওয়াইনির রচিত আল-গিয়াসি গ্রন্থটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই গ্রন্থে তিনি রাজনৈতিক সংকট ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভাঙনের সম্ভাবনা নিয়ে আগাম বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন এবং তার বিকল্প তাত্ত্বিক সমাধান তুলে ধরেছেন।
চতুর্থ হিজরি শতক থেকে আব্বাসীয় খেলাফতের দুর্বলতা স্পষ্ট হতে থাকে। তুর্কি সেনাপতি ও শিয়া বুওয়াইহি শাসকদের প্রভাবের কারণে খলিফারা কার্যত ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন। ঐতিহাসিক ইবনে কাসির এই সময়কালকে বর্ণনা করে বলেছেন, “খলিফার কোনো আদেশ-নিষেধ বা উজির (মন্ত্রী) বলতে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।”
এই প্রেক্ষাপটে আল-জুওয়াইনি আল-গিয়াসি গ্রন্থ রচনা করেন, যা ‘আগাম রাজনৈতিক ফিকহ’ হিসেবে পরিচিতি পায়। তিনি এমন এক তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করেন, যেখানে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রাষ্ট্রহীন অবস্থার সমাধান আগে থেকেই নির্ধারণ করা হয়।
ইমাম মাওয়ার্দির চিন্তার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, তিনি খলিফার মর্যাদা রক্ষায় গুরুত্ব দিলেও জুওয়াইনি বাস্তবতাকে বেশি প্রাধান্য দেন। তিনি মনে করেন, শাসকের বংশের চেয়ে তার সক্ষমতা ও স্বাধীনতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি খলিফা কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারেন, তাহলে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত।
গ্রন্থটির নামকরণেও রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ দিক। ‘গিয়াস’ শব্দটি উদ্ধারকর্তা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যা রাজনৈতিক অন্ধকারে পথ হারানো জাতির জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত।
জুওয়াইনির চিন্তার প্রভাব পরবর্তী সময়ে ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে খালদুনের লেখায়ও প্রতিফলিত হয়। ক্ষমতার কাঠামো, শাসনের বৈধতা এবং সামাজিক সংহতির বিষয়গুলোতে তাঁর ধারণা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
সিএ/এমআর


