রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেলের সংকট ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবহন খাত থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে চালকদের কর্মঘণ্টা, আয় এবং ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
শনিবার (৬ ডিসেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, জ্বালানি নিতে আসা গাড়ির দীর্ঘ সারি। সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে অনেককে বিকেল কিংবা সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে করে কর্মদিবসের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে শুধুমাত্র জ্বালানি সংগ্রহের পেছনে।
বরিশালের গৌরনদীর বাসিন্দা এবং ঢাকায় মাইক্রোবাসচালক সাত্তার হোসেন জানান, সকাল ১১টায় লাইনে দাঁড়িয়েও বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত পাম্পের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেননি। তিনি বলেন, পাম্প পর্যন্ত পৌঁছতে আরও এক ঘণ্টা লাগবে। এভাবে তেল নিতে গেলে আর জীবন থাকে না।
একই চিত্র দেখা গেছে অন্য চালকদের মধ্যেও। অনেকেরই তেল নিতে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে। ফলে নির্ধারিত কাজের সময় কমে যাচ্ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে সাপ্তাহিক ছুটিও বাতিল করে দিচ্ছেন মালিকরা। এতে শারীরিক ক্লান্তি ও মানসিক চাপ বাড়ছে চালকদের মধ্যে।
রামপুরার বাসিন্দা মোহাম্মদ সোহেল, যিনি একটি ব্যক্তিগত গাড়ি চালান, জানান লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তিনি কোথাও যেতে পারেননি। অল্প অল্প করে গাড়ি এগোনোর কারণে গাড়ি ফেলে যাওয়ার সুযোগ নেই। পাশের দোকান থেকে কলা-রুটি খেয়ে দুপুরের খাবার সেরেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, কিছু অসাধু চক্র পাম্প থেকে তেল সরিয়ে বাইরে বেশি দামে বিক্রি করছে।
অন্যদিকে, প্রাইভেটকার চালক জাকির হোসেন বলেন, লাইনে দাঁড়িয়ে বারবার গাড়ি স্টার্ট দিতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, আর কতদিন এভাবে সংকট চলবে।
তেজগাঁও, গাবতলী, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেও অনেক চালক তেল পাননি। মিরপুরের নূর আলম জানান, সাতটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে শেষে দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল পেয়েছেন। সপ্তাহে অন্তত দুই দিন তেল নিতে গিয়ে বাড়তি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে, ফলে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কমে গেছে।
রাইড শেয়ার চালকদের ভোগান্তি আরও বেশি। প্রতিদিন তেল নেওয়ার প্রয়োজন হওয়ায় তাদের আয় কমে যাচ্ছে। ডেমরার বাসিন্দা নিজাম বলেন, প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে। এই সময়ে কোনো আয় হয় না, ফলে বাড়তি সময় কাজ করতে হচ্ছে।
একইভাবে, লালবাগের বাসিন্দা রিফাত হোসেন জানান, নিজের এলাকার পাম্পে তেল না পেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খোঁজ নিয়ে অন্য এলাকায় যেতে হয়েছে। তবুও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে তাকে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে গণপরিবহনেও। রাজধানীর রাস্তায় বাসের সংখ্যা কমে গেছে। অনেক বাস চালক জানিয়েছেন, তেলের অভাবে আগের তুলনায় ট্রিপ সংখ্যা কমাতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
গুলিস্তান-চন্দ্রা রুটের বাসচালক জাবেদ হোসেন জানান, আগে দিনে চারবার ট্রিপ দিতে পারলেও এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে তাদের আয়ও কমে গেছে।
সার্বিকভাবে, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের পরিবহন খাতসহ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সময়সূচি বিঘ্নিত হচ্ছে, আয় কমছে এবং দৈনন্দিন জীবন হয়ে উঠছে আরও কষ্টসাধ্য।
সিএ/এএ


