কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে রেলওয়ের কর্মীদের একাধিক স্তরে দায়িত্ব অবহেলার তথ্য উঠে এসেছে। শুধু গেটম্যানদের নয়, বরং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মী, ট্রেনের চালক, বাসচালক এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতাকেও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
রোববার (২৯ মার্চ) সন্ধ্যায় কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. মেহেদী মাহমুদ আকন্দের কাছে ১১ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী ও অন্য সদস্যরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পেছনে পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিংয়ের চারজন গেটম্যান ছাড়াও কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর লেভেল ক্রসিংয়ের দুই গেটম্যান, লালমাই রেলস্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টার, ট্রেনের দুই চালক বা লোকোমাস্টার, বাসচালকের অদক্ষতা এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্মাণকাজে অবহেলার বিষয়গুলো দায়ী ছিল। তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে আটটি সুপারিশও করেছে।
গত ২১ মার্চ দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী একটি মেইল ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের পর ট্রেনটি বাসটিকে প্রায় ৭০০ মিটার দূর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায় এবং পরে দৈয়ারা এলাকায় গিয়ে থামে। এতে বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং তিন শিশুসহ ১২ জন নিহত হন। এ ঘটনায় বাসচালকসহ অন্তত ১৫ জন আহত হন। নিহত ও আহতরা সবাই বাসের যাত্রী ছিলেন।
ঘটনার পর নিহত এক যাত্রীর স্বজনের করা মামলায় ওই রেলক্রসিংয়ের তিনজন স্থায়ী ও অস্থায়ী গেটম্যানকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব ও পুলিশ।
দুর্ঘটনার পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দুটি ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে। তিনটি কমিটিকেই তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। ঈদের ছুটি শেষে গত মঙ্গলবার তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে জেলা প্রশাসনের কমিটি এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তারা প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিআরটিএর সহকারী পরিচালক ফারুক আলম, ময়নামতি ক্রসিং হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল মমিন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কুমিল্লার সহকারী পরিচালক মো. ইকবাল হোসেন এবং রেলওয়ের সহকারী পরিবহন কর্মকর্তা আসিফ খান চৌধুরী।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার রাতে পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বে ছিলেন গেটম্যান মো. হেলাল ও মো. মেহেদী হাসান। কিন্তু তাঁরা নিজেরা দায়িত্ব পালন না করে অন্য শিফটের গেটম্যান কাউসার হোসেন ও নাজমুল হোসেনকে এক হাজার টাকার বিনিময়ে দায়িত্ব দিতে বলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, কাউসার ও নাজমুল ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকায় রেলক্রসিংয়ের গেট নামানো হয়নি। তদন্ত কমিটির মতে, এই চারজনের দায়িত্বহীনতার কারণেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিজয়পুর লেভেল ক্রসিং অতিক্রম করার পর সেখানে দায়িত্বে থাকা গেটম্যানদের নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী পদুয়ার বাজার ক্রসিংয়ের গেটম্যানদের ফোনে সতর্ক করার কথা ছিল। কিন্তু তারা তা করেননি। একই ধরনের অবহেলার অভিযোগ উঠেছে লালমাই রেলস্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টারের বিরুদ্ধেও। তিনি নিয়ম অনুযায়ী গেটম্যানদের সঙ্গে যোগাযোগ না করে ট্রেনচালককেও সতর্ক করেননি।
তদন্ত প্রতিবেদনে ট্রেনের দুই চালকের বিরুদ্ধেও দায়িত্বে অবহেলার কথা বলা হয়েছে। সাধারণত প্রতিটি রেলক্রসিংয়ে গেটম্যানদের দেওয়া সবুজ সংকেতের পর ট্রেন এগিয়ে যায়। কিন্তু এখানে গেট না নামানোয় কোনো সংকেত দেওয়া হয়নি। তবু চালকেরা ট্রেনের গতি কমাননি। তদন্ত কমিটির মতে, তারা গতি কমালে দুর্ঘটনা ঘটলেও প্রাণহানি কম হতে পারত।
বাসচালকের অদক্ষতাও দুর্ঘটনার একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। রেলক্রসিংয়ে ওঠার আগে দুই পাশ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত ছিল, কিন্তু চালক তা করেননি। ওই এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চার লেনের একটি রেলওয়ে ওভারপাস থাকলেও বাসটি সেটি ব্যবহার না করে নিচের ক্রসিং দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তদন্ত কমিটির মতে, পরিবহন কর্তৃপক্ষেরও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তের অভাব ছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পদুয়ার বাজার এলাকায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ইউলুপ নির্মাণকাজ চলছিল। নির্মাণকাজের জন্য রেলক্রসিংয়ের পাশে দুটি ঘর নির্মাণ করা হয়, যার কারণে রেললাইন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল না। এতে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং রেলওয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
তদন্ত কমিটি ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আটটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে গেটম্যানদের নিয়মিত তদারকি জোরদার করা, পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে সতর্কতামূলক বেল ও লাইট চালু করা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সওজ ও রেলওয়ের সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি রেলক্রসিংয়ে সিসি ক্যামেরা স্থাপন।
এ ছাড়া রেলক্রসিংগুলো ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে। গেটম্যানদের কাজের পরিবেশ উন্নত করা এবং তাদের কক্ষে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
দুর্ঘটনার পর এক গেটম্যানের মাদকাসক্তির বিষয়টি আলোচনায় আসে। এ কারণে তদন্ত কমিটি প্রতি মাসে অন্তত একবার গেটম্যানদের ডোপ টেস্ট করার সুপারিশ করেছে। মাদকাসক্ত প্রমাণিত হলে তাকে চাকরিচ্যুত করার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী বলেন, ‘আমরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গুরুত্বসহকারে তদন্ত কাজটি শেষ করেছি। তদন্তে যেসব ধাপে অবহেলা প্রতীয়মান হয়েছে, সেগুলোর কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন আমাদের এমন প্রাণহানি আর দেখতে না হয়, এ জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ৮টি সুপারিশ করা হয়েছে।’
সিএ/এমই


