বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় প্রচলিত ধারণা ও বয়ানকে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করেছে সহুল আহমদের গ্রন্থ ‘ইতিহাস ও বয়ান: পাকিস্তান আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’। বইটিতে ইতিহাসকে কেবল ঘটনাপ্রবাহ নয়, বরং নির্মিত আখ্যান হিসেবে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে।
লেখকের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে নির্ধারিত বয়ানের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে। এর ফলে প্রকৃত ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা অনেক ক্ষেত্রে আড়াল হয়েছে।
গ্রন্থের প্রথম অংশে পাকিস্তান আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার প্রবণতার সমালোচনা করা হয়েছে। লেখক দেখাতে চেয়েছেন, এই দুই আন্দোলনের মধ্যেই জনগণের আকাঙ্ক্ষা, স্বায়ত্তশাসনের চেতনা এবং গণতান্ত্রিক দাবি একটি ধারাবাহিক স্রোত হিসেবে বিদ্যমান ছিল।
এ আলোচনায় শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আবুল মনসুর আহমদ ও কামরুদ্দিন আহমদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধকে পূর্ববর্তী সংগ্রামের ধারাবাহিক ফল হিসেবেই দেখা হয়েছে।
তবে সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলানোর কারণে ইতিহাসের বয়ানেও পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দুই ঘটনাকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা বাড়ে।
লেখক উল্লেখ করেছেন, পাকিস্তান আন্দোলনে মুসলিম জাতীয়তাবাদ এবং মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদ—এই দুই ভিন্ন মতাদর্শ ব্যবহৃত হলেও জনগণের লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ ছিল।
বইটিতে আরও আলোচনা করা হয়েছে, দুই বাংলার বয়ানের পার্থক্য নিয়েও। একই ঐতিহাসিক ঘটনাকে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা ইতিহাসের রাজনৈতিক চরিত্রকে স্পষ্ট করে।
দ্বিতীয় অংশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে একই বিশ্লেষণ কাঠামোর মধ্যে এনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, এটি কি পূর্ববর্তী ইতিহাসের বিরোধী, নাকি ধারাবাহিকতার অংশ। লেখকের মতে, এটিকে ধারাবাহিক গণআকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা জরুরি।
এছাড়া ‘স্মৃতি’ ও ‘সহিংসতা’ প্রসঙ্গে লেখক দেখিয়েছেন, কোন ঘটনা স্মরণীয় হবে আর কোনটি বিস্মৃত হবে—তা নির্ধারণে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার প্রভাব রয়েছে।
সব মিলিয়ে, বইটি ইতিহাসের প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে এবং ইতিহাসচর্চার রাজনৈতিক দিকটি নতুনভাবে ভাবতে উৎসাহ দিয়েছে।
সিএ/এমআর


