বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণে অবস্থিত রুহিতা সৈকত গোধূলিবেলায় ধরা দেয় এক অপূর্ব রূপে। পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমলা আভা নেমে আসে বনঘেরা নদীর জলে। আলো আর ছায়ার মিশেলে তৈরি হয় এক মায়াবী দৃশ্য, যা চোখে যতটা ধরা পড়ে তার চেয়েও গভীরভাবে স্পর্শ করে মানুষের মন। গোধূলির এই সময়টিতে প্রকৃতি যেন নিজেই নিঃশব্দে এঁকে যায় এক অনন্য চিত্রপট।
পাথরঘাটা থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই সৈকত দীর্ঘদিন ধরেই ছিল আড়ালে। নির্জন পরিবেশ, বালিয়াড়ি, সবুজ বন আর নদীর জল মিলিয়ে তৈরি হয়েছে শান্ত এক উপকূলীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সৈকতজুড়ে নেমে আসে ধ্যানমগ্ন এক আবহ, যেখানে দিন আর রাতের মাঝামাঝি সময়টুকু যেন অন্য এক অনুভূতির জন্ম দেয়।
পাথরঘাটা অঞ্চলটি নদী, সাগর ও মানুষের সহাবস্থানে গড়ে ওঠা একটি উপকূলীয় জনপদ। এই এলাকার এক নিভৃত কোণে দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে ছিল রুহিতা সৈকত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আড়াল ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। নতুন নতুন পর্যটকের আগমনে এখন জায়গাটি ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে।
রুহিতা সৈকতে কোলাহল কম, আছে শুধু শান্ত ঢেউয়ের শব্দ আর দীর্ঘ নির্জন তটরেখা। ভোরের প্রথম আলো সাগরের বুকে ছড়িয়ে পড়লে আকাশ আর জলের মিলনে তৈরি হয় এক কোমল স্বপ্নময় দৃশ্য। দুপুরের দিকে সূর্যের আলোয় বালুকাবেলা সোনালি হয়ে ওঠে। বাতাসে লবণাক্ত গন্ধ আর ঢেউয়ের ছন্দময় শব্দ মিলে তৈরি করে এক প্রশান্ত পরিবেশ।
সৈকতের পাশেই রয়েছে একটি জেলেপল্লি। ভোর হলেই মাছ ধরার নৌকা সাগরের দিকে রওনা দেয়। বিকেলে জেলেরা ফিরে আসেন দিনের পরিশ্রম আর অভিজ্ঞতার গল্প নিয়ে। জেলেদের এই কর্মব্যস্ত জীবন উপকূলীয় মানুষের বাস্তবতার এক সরল চিত্র তুলে ধরে, যা পর্যটকদের জন্য হয়ে ওঠে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
পাথরঘাটার ভূপ্রকৃতিই এই সৌন্দর্যের বড় কারণ। দক্ষিণের তিনটি প্রধান নদ-নদী বিষখালী, বলেশ্বর ও পায়রা এসে মিশেছে বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত জলে। নদী আর সাগরের মিলনে তৈরি হয় জলের অনন্য রঙের খেলা। কখনো কাদামাটির আভা, আবার কখনো গভীর নীলের বিস্তার দেখা যায় এখানে। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে বদলে যায় তটরেখা, ফলে প্রতিদিনই যেন নতুন রূপে ধরা দেয় রুহিতা।
পাথরঘাটা পৌর শহরের গোলচত্বর থেকে ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল বা ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে সহজেই যাওয়া যায় সৈকতে। তবে সেখানে যাওয়ার সড়ক এখনো খুব উন্নত নয়। সৈকতের কাছেই রয়েছে পদ্মা সৈকত ও হরিণঘাটা বনাঞ্চল। পাশাপাশি বলেশ্বর নদীর মধ্যে জেগে ওঠা বিহঙ্গ দ্বীপও পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। ওই দ্বীপ ঘুরে দেখানোর জন্য স্থানীয়ভাবে কয়েকটি নৌযানের ব্যবস্থাও রয়েছে।
দীর্ঘদিন সড়ক যোগাযোগ ভালো না থাকায় রুহিতা সৈকত অনেকটাই অজানা ছিল পর্যটকদের কাছে। তবে গত দুই বছরে কিছু ভ্রমণপিপাসু মানুষ এখানে আসতে শুরু করেছেন। তবুও উন্নত সড়ক, বিশ্রামাগার ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর অভাবে এখনো পুরোপুরি বিকশিত হয়নি এই পর্যটন সম্ভাবনাময় এলাকা।
ঈদের দ্বিতীয় দিন রোববার সৈকতে গিয়ে দেখা যায় পর্যটকদের ভিড়। শিশুরা দোলনায় দোল খাচ্ছে, কেউ বালিয়াড়িতে হাঁটছেন, আবার কেউ ছবি তুলছেন। অনেকেই পর্যটক নৌকায় করে বিহঙ্গ দ্বীপ কিংবা তিন নদ-নদী আর সাগরের মোহনার দৃশ্য দেখতে যাচ্ছেন।
ঈদের ছুটিতে বরিশাল থেকে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে এসেছেন ব্যাংকার আখিরুজ্জামান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে আগেও এসেছি। পথঘাট ভালো না হওয়ায় আসতে বেশ ধকল যায়। তবু এখানে আসার পর সব কষ্ট মুছে যায়। তাই আবার দ্বিতীয়বার এসেছি।’
খুলনা থেকে শ্বশুরবাড়িতে এসে সেখান থেকে রুহিতা সৈকতে ঘুরতে এসেছেন আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘রুহিতার সৌন্দর্যের ছবি-ভিডিও দেখেছি। আবার যাঁরা এখানে এসেছেন, তাঁদের কাছে বর্ণনা শুনেছি। তাই এবার ঈদের ছুটিতে বেড়াতে এসে এখানে আসার লোভ সামলাতে পারিনি। সত্যি জায়গাটা খুব সুন্দর।’ যাতায়াতের সমস্যার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে রাস্তাঘাট ভালো না হওয়ায় জায়গাটি জনপ্রিয় হচ্ছে না। এমন সুন্দর একটি স্থানে আসতে এত ভোগান্তি! দেখে আসলে হতাশ হয়েছি।’
এ বিষয়ে পাথরঘাটার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপস পাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে সদ্য যোগদান করেছি। ওই এলাকা পরিদর্শন করে এখানে পর্যটনবান্ধব যে পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন, সেই ব্যাপারে সরকারকে অবহিত করব। একই সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ভালো করতে উদ্যোগ নেব।’
সিএ/এমই


