সাতক্ষীরার তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে অবস্থিত তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ ছায়াময় পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ছোট-বড় মিলিয়ে ২০টি মিনার রাজসিক আভা ছড়িয়েছে। চারপাশের গাছপালার মধ্যে সারি সারি সাদা গম্বুজ ও উঁচু মিনার দূর থেকে চোখে পড়ে। শুক্রবার (১৭ মার্চ) দেখা যায়, সময় যেন এখানে থেমে আছে।
মসজিদটি স্থাপন করেন তেঁতুলিয়া পরগনার তৎকালীন জমিদার ছালামাতুল্লাহ খান। গায়ে খোদাই করা ইংরেজি ও বাংলা হরফে লেখা আছে, ১৮৫৮-৫৯ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। এর হিসাব মতে, মসজিদটি ১৬৭ বছরের বেশি সময় ধরে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মসজিদ চত্বরে খোদাই করা লেখায় আরও জানা যায়, ১৮৪০-৪১ সালে কলকাতার মাহবানী বেগম মসজিদ ও ১৮৪২ সালে কলকাতার ধর্মতলায় টিপু সুলতান মসজিদের সঙ্গে তেঁতুলিয়া জামে মসজিদের স্থাপত্যশৈলীর সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। মিজানুর রহমানের ‘সাতক্ষীরা পুরাকীর্তি’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ছালামাতুল্লাহ খান কলকাতায় গিয়ে জাকারিয়া স্ট্রিটের পট্টি মসজিদের নান্দনিক স্থাপত্যে মুগ্ধ হয়ে নিজ জমিদারিতে অনন্য মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। পরবর্তীতে দিল্লি থেকে নির্মাতাকে এনে তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ গড়ে তোলা হয়।
মসজিদে চার কোণায় চারটি সুউচ্চ মিনার আছে, এবং ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২০টি মিনার পুরো স্থাপনাটিকে রাজসিক আভা দিয়েছে। ছাদের ওপর দুই সারিতে ছয়টি বড় গম্বুজ ও চারপাশে ছোট গম্বুজ স্থাপনাকে অলংকারের মতো ঘিরে রেখেছে। মসজিদে খিলানযুক্ত সাতটি দরজা আছে, প্রতিটি প্রায় আট ফুট উচ্চ এবং সাড়ে চার ফুট প্রস্থের। ভিতরে দুটি বড় গোলাকার স্তম্ভ গম্বুজের ভার বহন করছে।
দেয়ালের টেরাকোটার কারুকাজে ফুটে উঠেছে লতাপাতা, চাঁদ ও তারার নকশা। বিকেলের আলো পড়লে এই কারুকাজ আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের মতে, মসজিদের মেঝে ও দেয়াল পালিশ করতে সুরকি-বালুর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ ডিমের সাদা অংশ মেশানো হয়েছিল। এর ফলে শতাধিক বছর পরও মেঝের মসৃণতা দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়ে।
মসজিদটি দুটি অংশে বিভক্ত। পশ্চিম পাশে রয়েছে ছাদযুক্ত মূল নামাজঘর (দৈর্ঘ্য ৪৭ ফুট, প্রস্থ ৩০ ফুট), পূর্ব পাশে ছাদবিহীন চত্বর (দৈর্ঘ্য ৩৭ ফুট, প্রস্থ ৩০ ফুট) রয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় কমিটি সেখানে টিনের ছাউনি দিয়েছে। মসজিদের ভিতরে প্রায় ১৫০ জন এবং বাইরে ২০০ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।
১৯৮৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অর্থায়নে মসজিদ ও চত্বরের মেঝে সংস্কার করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন খতিব মো. আবদুর রব। তিনি জানান, সেই সংস্কারের পর মেঝের অবস্থা আগের মতো নেই। স্থানীয়ভাবে মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা কাজী মহিবুল ইসলাম বলেন, ‘দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এই ঐতিহাসিক মসজিদ দেখতে আসে। কিন্তু আগের টেরাকোটার নান্দনিক সৌন্দর্যের অনেকটাই এখন সাধারণ রঙের প্রলেপে ঢাকা পড়েছে।’
মসজিদ কমিটির আহ্বায়ক কাজী শামীমুল ইসলাম বলেন, ‘প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ একসময় কিছু সংস্কার করলেও এখন আর তেমন উদ্যোগ দেখা যায় না। দ্রুত সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ না করা হলে ঐতিহাসিক এই স্থাপনা ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।’
সিএ/এমই


