নড়াইলে জ্বালানি তেলের সংকটে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনেক কৃষক এক ফিলিং স্টেশন থেকে আরেকটিতে ঘুরেও ডিজেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এতে সেচ ব্যাহত হওয়ায় ধানচাষ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
শনিবার (১৪ মার্চ) দুপুরে নড়াইল সদর উপজেলার মাছিমদিয়া এলাকার সরদার ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে এমন হতাশার কথা জানান পলইডাঙ্গা গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, বোরো ধানের জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য নিজ এলাকায় ডিজেল না পেয়ে সকালে বাইসাইকেলে করে শহরে এসেছিলেন। কিন্তু দুপুর পর্যন্ত কয়েকটি পাম্প ঘুরেও কোথাও এক লিটার তেল পাননি।
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এলাকায় যে কয়ডা দুকান, সবই বন্ধ। শহরে আইসেও কোথাও কোনো ব্যবস্থা করতি পারিনি। এই যে দেহেন, ড্রাম খালি, বাড়ির দিকি রওনা হইছি। আমার নিজের ধানও যাচ্ছে (নষ্ট হচ্ছে), অন্যদেরও যাচ্ছে। গাড়িআলারা তেল পাচ্ছে, আমরা কৃষকেরা পাচ্ছিনে। আমাগের জন্যি কি কোনো বাজেট নেই? আমরা তো আর তেল নিয়ে নষ্ট করিনে।’
নড়াইলের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা আরও অনেক কৃষক ডিজেলের সন্ধানে এক দোকান থেকে আরেক দোকান এবং এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ঘুরছেন। কিন্তু কোথাও মিলছে না ডিজেল। ফলে বোরো ধানের আবাদ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
কৃষক রমজান আলী বলেন, ‘এখন বোরোর ভরা মৌসুম চলতিছে। আমি কুড়ি কিলোমিটার দূর থেকে সাথে করে ড্রাম নিয়ে আইছি ডিজেল নিতে। তিনটে পাম্পে গেছি, তিনটেই বন্ধ, ডিজেল নেই। কীভাবে কৃষকরা ধানে পানি দেবে?’
শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নড়াইল জেলা শহর ও আশপাশের পাঁচটি তেলের পাম্প ঘুরে দেখা যায়, একটি পাম্পে সীমিত পরিমাণে শুধু পেট্রল বিক্রি হচ্ছে। সেখানে মোটরসাইকেল চালকেরা রেশনিং পদ্ধতিতে স্বল্প পরিমাণে তেল নিচ্ছেন। অন্য চারটি পাম্পে রশির সঙ্গে লাল কাপড় বেঁধে তেল না থাকার সংকেত দেওয়া হয়েছে। এসব পাম্পে ডিজেল, পেট্রল বা অকটেন কোনোটিই পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সেচের তেল নিতে আসা কৃষক ও বিভিন্ন যানবাহনের চালকেরা ফিরে যাচ্ছেন।
কিছু ক্রেতার অভিযোগ, কোথাও কোথাও তেল মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। আবার অতিরিক্ত দাম দিলে খুচরা দোকানে তেল পাওয়া যাচ্ছে বলেও দাবি করেছেন অনেকে।
নড়াইল-মাগুরা আঞ্চলিক সড়কে বাস চালক রিপন শেখ বলেন, ‘তেলের অভাবে তিন-চার দিন গাড়ি বন্ধ। সামনে ঈদ, এখন যদি গাড়ি চালাতে না পারি, আমরা কোনোভাবে চলব?’
তেল কিনতে এসে এক ক্রেতা বলেন, ‘সরকার বলতিছে, তেলের কোনো সংকট নেই। তালি পাম্প সব কটি বন্ধ হবে কেন? কিছু কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তেল মজুত রেখে কৃত্রিম সংকটও তৈরি করেছে, যার কারণে ডিজেলের ঘাটতি হচ্ছে। আবার বেশি টাকা দিলে ঠিকই তেল পাওয়া যাচ্ছে।’
পিকআপ চালক জাকির হোসেন বলেন, ‘পাম্পে গিলি তেল পাওয়া যাচ্ছে না, দোকানে গিলি পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক জায়গায় বেশি টাকা দিলি তেল পাওয়া যাচ্ছে। আমি নিজিই কিনিছি। টাকা বাড়ায় দিলি এই তেল কোথা থেকে আসতিছে?’
তবে জ্বালানি তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পাম্পসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের দাবি, ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় কম তেল আসায় এবং ক্রেতাদের চাপ বেশি থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সরদার ফিলিং স্টেশনের কর্মী সাকিব হোসেন বলেন, ‘আমাদের এখানে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল কিছুই নেই। আর তেলের দাম বাড়ানোর কোনো বিষয় নেই। আসলে তেল ডিপো থেকেই দিচ্ছে না। বৃহস্পতিবার আমরা ডিজেল আর অকটেন পাইছি ডিপো থেকে, পেট্রল পাইনি।’
পাশের পিষণ ফিলিং স্টেশনের কর্মী আরাফাত আলী বলেন, ‘গতকাল শুক্রবার থাকায় ডিপো থেকে তেল আসেনি। তেল ফুরিয়ে যাওয়া এক ঘণ্টার মতো হলো, আমরা পাম্প বন্ধ করে দিয়েছি। এ ছাড়া বেশি টাকা দিলে তেল পাওয়ার কোনো ঘটনা নেই। এটা বাইরের দোকানগুলোতে হতে পারে। আর আমাদের এখানে বড় কর্মকর্তারা এসে দেখে গেছে, কোনো মজুত পায়নি।’
এ বিষয়ে প্রশাসনের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গেলে শনিবার ছুটির দিন হওয়ায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল ছালাম ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
সিএ/এমই


