বান্দরবানের বম জনগোষ্ঠীর কয়েকজন বিপথগামী তরুণের কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো সম্প্রদায় নানা সংকটে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বম সোশ্যাল কাউন্সিলের (বিএসসি) সভাপতি ও বম জনগোষ্ঠীর শীর্ষ নেতা লালজার লম বম। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে বম জনগোষ্ঠীর কোনো পরিবারকে আর উচ্ছেদ হতে দেওয়া হবে না এবং বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে সবাইকে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
শনিবার (১৪ মার্চ) বান্দরবান জেলা শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত হেব্রনপাড়া প্রতিষ্ঠার ৪০তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। লালজার লম বম একই সঙ্গে বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থানজামা লুসাই। সভায় সভাপতিত্ব করেন পাড়ার কারবারি (পাড়াপ্রধান) লাল লিয়ানজল বম। এছাড়া বক্তব্য দেন রেভারেন্ড জার্মান সাইলুক, সাংমুয়ান বম, পাকসিম বম এবং কে রেমা পাংখোয়া। আলোচনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বম সম্প্রদায়ের সদস্যদের উচ্ছেদ, গ্রেপ্তার এবং বিভিন্ন সংকটের বিষয়ও উঠে আসে।
সভায় হেব্রনপাড়া ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি লালরিং সাং বম পাড়াটি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি জানান, রোয়াংছড়ি উপজেলার আলেক্ষ্যং মৌজার চোয়াবিলপাড়া ও উইপোমপাড়া নামে দুটি সমৃদ্ধ পাড়ায় একসময় তাদের বসবাস ছিল। আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ১৯৮০ সালে মাত্র দুই দিনের নোটিশে সেখান থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হয়। এরপর ঘরবাড়ি ও সহায়সম্বল হারিয়ে ৬৪টি পরিবার প্রথমে কচ্ছপতলী এলাকায় খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নেয়।
পরে ১৯৮৬ সালে তারা সর্বস্ব হারানো অবস্থায় হেব্রনপাড়ায় এসে বসতি গড়ে তোলে। শুরুতে জীবিকা নির্বাহের জন্য অনেকেই বান্দরবান শহরে জ্বালানি কাঠ বিক্রি ও দিনমজুরি করতেন। দীর্ঘ সময়ের সংগ্রামের পর বর্তমানে পাড়ার অধিকাংশ পরিবার অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হয়েছে। পাড়ার তরুণ-তরুণীদের প্রায় ৬০ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত এবং প্রায় ১৪ শতাংশ পরিবারে সরকারি বা বেসরকারি চাকরিজীবী রয়েছেন।
বম সোশ্যাল কাউন্সিলের সভাপতি লালজার লম বম বলেন, কিছু বিপথগামী বম যুবকের কারণে ২০২২ সাল থেকে পুরো বম সম্প্রদায় গুরুতর সংকটে পড়েছে। তিনি বলেন, সমাজের ভেতর থেকেও কেউ কেউ সত্য গোপন করে ওই তরুণদের প্রশ্রয় দিয়েছেন। এখন সময় বদলেছে, তাই সত্য গোপন না করে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি আরও জানান, বম সোশ্যাল কাউন্সিল প্রত্যেকটি পাড়ায় গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবে এবং কোনো বম পরিবারকে আর উচ্ছেদ হতে দেওয়া হবে না।
উল্লেখ্য, কয়েক বছর আগে বম সম্প্রদায়ের কিছু যুবক কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) নামে একটি সশস্ত্র সংগঠন গঠন করে। সমতলের উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগে ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে নিরাপত্তা বাহিনী সংগঠনটির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে।
অভিযান চলাকালে ২০২৪ সালের এপ্রিলে রুমা ও থানচি এলাকায় ব্যাংক ডাকাতি এবং পুলিশের অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে, যার সঙ্গে কেএনএফ সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। এরপর চলমান অভিযানের প্রেক্ষাপটে বম জনগোষ্ঠীর ১৯৭ জন নারী-পুরুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে এখনো ৯ জন নারীসহ মোট ৯০ জন কারাগারে বন্দী রয়েছেন।
সিএ/এমই


