রমজান মাসে মালয়েশিয়ায় ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায়। ইফতারের আয়োজন থেকে শুরু করে তারাবির নামাজ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশটির নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে রাজধানী কুয়ালালামপুরে আধুনিক আকাশচুম্বী ভবনের নিচে বসা ঐতিহ্যবাহী রমজান বাজার এ সময় ভিন্ন এক পরিবেশ তৈরি করে।
মালয়েশিয়ায় রমজানের অন্যতম পরিচিত খাবার হলো বুবুর লাম্বুক। এটি চাল, গরুর মাংস বা চিংড়ি, নারকেলের দুধ এবং বিভিন্ন মশলা দিয়ে তৈরি এক ধরনের ঘন খিচুড়ি বা স্যুপজাতীয় খাবার। স্থানীয়দের কাছে এটি রমজানের একটি বিশেষ খাবার হিসেবে পরিচিত।
কুয়ালালামপুরের কাম্পুং বারু মসজিদে প্রতিদিন বড় বড় ডেকচিতে এই খাবার রান্না করা হয়। আসরের নামাজের পর থেকেই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ এই খাবার সংগ্রহ করেন। হাজার হাজার মানুষের মাঝে এটি বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়।
অনেক পরিবার নিজেদের ঘরেও বুবুর লাম্বুক রান্না করে প্রতিবেশী ও পথচারীদের মাঝে বিতরণ করেন। এতে সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের চিত্র ফুটে ওঠে।
রমজানের আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো মালয়েশিয়ার রমজান বাজার। আসরের নামাজের পর দেশের বিভিন্ন সড়ক ও এলাকায় শত শত বাজার রামাদান বা পাসার রমাদান বসে। এসব বাজারে নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার পাওয়া যায়।
লেমাং নামের একটি জনপ্রিয় খাবার এখানে বিশেষভাবে বিক্রি হয়। এটি বাঁশের নলের ভেতর কলাপাতায় মোড়ানো চাল ও নারকেলের দুধ দিয়ে রান্না করা হয়। পাশাপাশি মুর্তাবাক এবং পুতু পিরিংসহ বিভিন্ন মিষ্টান্নও পাওয়া যায় এসব বাজারে।
এই বাজারগুলো শুধু মুসলিমদের জন্য নয়। মালয়েশিয়ার চীনা ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত অমুসলিম নাগরিকরাও এখানে ভিড় করেন। তারা মুসলিমদের ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে রমজান বাজারের খাবার ও কেনাকাটার অভিজ্ঞতা উপভোগ করেন।
রমজানের রাতে মালয়েশিয়ার মসজিদগুলোতে সাধারণত ২০ রাকাত তারাবির নামাজ আদায়ের প্রচলন রয়েছে। অনেক ইমাম মক্কা ও মদিনার হারামাইনের ইমামদের সুর অনুসরণ করে কোরআন তিলাওয়াত করেন। আবার কেউ কেউ মিসরের বিখ্যাত কারিদের তেলাওয়াতের ধারা অনুসরণ করেন।
তারাবির নামাজ শেষে অনেক মসজিদের বারান্দায় মুসল্লিদের জন্য হালকা নাস্তার ব্যবস্থা থাকে। স্থানীয় ভাষায় এই আয়োজনকে বলা হয় মোরহ।
রমজানের বিশেষ একটি দিন হিসেবে ১৭ রমজান মালয়েশিয়ায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। কোরআন নাজিলের এই দিনটি উপলক্ষে দেশটির অনেক প্রদেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়।
এই দিনে রাজা ও প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন কোরআন তিলাওয়াত ও হিফজ প্রতিযোগিতার প্রধান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন। এতে ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও দিনটি বিশেষ মর্যাদা পায়।
রমজান মাসে মালয়েশিয়া পর্যটকদের জন্যও আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য হয়ে ওঠে। বড় বড় মসজিদে নামাজের সময় শিশুদের জন্য আলাদা নার্সারি ও খেলার ব্যবস্থা রাখা হয়, যাতে অভিভাবকেরা স্বাচ্ছন্দ্যে ইবাদত করতে পারেন।
এছাড়া ঈদকে সামনে রেখে দেশটির বড় শপিং মলগুলোতে বিশেষ ছাড় এবং ইসলামি সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়, যা স্থানীয়দের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে।
সিএ/এমআর


