দেশে গত এক বছরে ধর্ষণের মামলার সংখ্যা ২৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের হওয়া মোট মামলার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেই রোববার (৭ ডিসেম্বর) দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার: সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’।
ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে গেলে নারী নির্যাতনের বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আদালতের কক্ষের ভেতরে জায়গা না হওয়ায় অনেক ভুক্তভোগী নারী ও তাঁদের স্বজনদের বারান্দায় বসে থাকতে দেখা যায়। মামলার নম্বর ধরে ডাক পড়লে তাঁরা উৎকণ্ঠা নিয়ে বিচারকের সামনে হাজির হন।
ট্রাইব্যুনাল কক্ষের ভেতরে অনেক সময় মাইক্রোফোনে ভুক্তভোগীদের নির্যাতনের বিবরণ শোনা যায়। এসব বর্ণনা আদালত চত্বরে উপস্থিত অনেকের মধ্যেই গভীর উদ্বেগ ও বেদনাবোধ তৈরি করে। একটি ট্রাইব্যুনালে অপেক্ষমাণ এক তরুণী জানান, তিনি প্রেমিকের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করতে এসেছেন। কথা বলতে বলতে মানসিক চাপে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে সারা দেশে মোট ২১ হাজার ৯৩৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৬৮টি মামলা ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ৫ হাজার ১৭১ জন এবং শিশু ১ হাজার ৮৯৭ জন।
এর আগের বছর ২০২৪ সালে নারী নির্যাতনের অভিযোগে মামলা হয়েছিল ১৭ হাজার ৫৭১টি, যার মধ্যে ধর্ষণের মামলা ছিল ৫ হাজার ৫৬৬টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নারী নির্যাতনের মামলা বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ এবং ধর্ষণের মামলার সংখ্যা বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের কয়েকটি আলোচিত ঘটনা জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পাবনায় এক কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা, নরসিংদীতে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এক কিশোরীর হত্যাকাণ্ড, সীতাকুণ্ডে সাত বছরের এক শিশুর ওপর যৌন সহিংসতার পর গলা কেটে হত্যার চেষ্টা এবং কক্সবাজারের উখিয়ায় এক গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনার কিছুতে মামলা হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে।
নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতা ও বিদ্বেষমূলক আচরণ বন্ধ করা শুধু সরকারের একার কাজ নয়, এটা সবার দায়িত্ব। এটা মোকাবিলায় সম্মিলিত সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, নারীর মর্যাদা রক্ষায় সমাজের সব স্তরে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উচ্চ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মোট ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩০ হাজার ৩৬৫টি। ঢাকার ৯টি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১১ হাজার ৫৬৭টি।
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক বলেন, ‘নারীর ওপর সহিংসতা, সহিংসতার হুমকি, নিপীড়ন, হেনস্তা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীর ওপর খবরদারি করতে পারার প্রবণতার একটা পর্যায় হচ্ছে নারীর ওপর সহিংসতা। পুরুষের আত্মবিশ্বাস রয়েছে যে নারীর ওপর সহিংসতা করার তার অধিকার আছে এবং সে পার পেয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।
গত পাঁচ বছরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দুইবার সংশোধন আনা হয়েছে। ২০২৫ সালে জারি করা সংশোধনী অনুযায়ী বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে আলাদা ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এ অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ধর্ষণ মামলার তদন্ত ও বিচারের সময়সীমা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আইন অনুযায়ী ধর্ষণের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড নির্ধারিত রয়েছে। এছাড়া আদালত প্রয়োজন মনে করলে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়াও মেডিক্যাল সনদের ভিত্তিতে বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন মনে করেন, নারী নির্যাতনের ঘটনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে মোকাবিলা করা জরুরি। তাঁর মতে, ভুক্তভোগীদের জন্য আইনি সহায়তা, চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং সাক্ষী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
সিএ/এমই


