জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন পরিকল্পনা করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে টার্গেট করা হচ্ছে। ৫ আগস্টের পর থেকে এবং এই নির্বাচনের পর থেকে সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও গ্রিন সিগন্যালে ব্যাপকভাবে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। সেই উদ্দেশ্যে নানা সংবাদ, তথ্য ও অপতথ্য প্রচার করা হচ্ছে। সারা দেশে নানা প্রক্রিয়ায়, নানা পন্থায় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে।’
শনিবার (৬ ডিসেম্বর) বিকেলে ফরিদপুর শহরের ঐতিহাসিক অম্বিকা ময়দানে জাতীয় নাগরিক পার্টি আয়োজিত ইফতার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জেলা এনসিপির আহ্বায়ক বায়েজিদ হোসেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা উপস্থিত ছিলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা খুব স্পষ্টভাবে বলতে চাই—ফ্যাসিস্টদের কোনো ক্ষমা নেই। ফ্যাসিস্টদের বিচার এবং ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিচার এই বাংলার মাটিতে হবেই ইনশা আল্লাহ। এই পথে যারা বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা দাঁড়াব। তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ দাঁড়াবে।’
মুক্তিযুদ্ধকে বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাসের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে, সেই ফ্যাসিস্টরা ১৬ বছর ধরে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম, ৭ মার্চের নাম এবং মুক্তিযুদ্ধের নাম ব্যবহার করে তাদের সকল অপকর্ম—লুণ্ঠন, গণহত্যা, গুম, খুন—সবকিছুকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এ ধরনের অপচেষ্টাকারীদের আমরা হুঁশিয়ার করে দিতে চাই—এ ধরনের অপচেষ্টা করে কোনো লাভ হবে না। সংস্কারের পক্ষে আসুন, বিচারের পক্ষে আসুন, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের পক্ষে আসুন।’
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘মেঘ দেখলে বোঝা যায় বৃষ্টি হবে কি না। দিনের শুরুতেই আকাশ দেখলে বোঝা যায় দিনটা কেমন যাবে। এই সরকারের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছে, তারা বাংলাদেশকে কোন দিকে নিয়ে যেতে চায় এবং কীভাবে পরিচালিত করতে চায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে একটি বহুল আকাঙ্ক্ষিত নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু সেই নির্বাচনেও কলঙ্ক লাগানো হলো; সেই নির্বাচনকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা সবকিছু মেনে নিয়েই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আদেশ অনুযায়ী দুটি শপথ নিয়েছি। কিন্তু সরকারি দল একটি শপথ নিয়েই এই নির্বাচনের পরপরই সবার আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা এবং জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বেইমানি করেছে। যে গণভোট হয়েছে—যেখানে জনগণ ব্যাপকভাবে “হ্যাঁ”-এর পক্ষে তথা সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, সেই গণভোটের বৈধতা নিয়েও তারা নানা ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ এবং গণভোটের বৈধতাকে তারা আদালতে নিয়ে গেছে। তাদের সরকার দলীয় আইনজীবীরা আদালতে গিয়ে এর বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে এবং আদালতের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিগত আমলে আমরা শেখ হাসিনার শাসনামলে দেখেছিলাম, কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো—বিচার বিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ—সবকিছুকে দলীয়করণ করা হয়েছিল। সেই একই প্রবণতা আমরা এই সরকারের মাত্র এক মাসের শুরু থেকেই দেখতে পাচ্ছি।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা এই সরকারের সঙ্গে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলাম। আমরা দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকায় সংসদে এবং সংসদের বাইরে থাকতে চেয়েছি, এখনো চাই। কিন্তু সেটার জন্য সরকারকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আগামী ১২ তারিখ অধিবেশন হবে। সেই অধিবেশনের শুরুতেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নিতে হবে এবং ফ্যাসিস্টের রাষ্ট্রপতি অপসারণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এর অন্যথা যদি ঘটে, বিচ্যুতি যদি ঘটে, তাহলে ১১ দলকেও এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিকেও আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে হবে।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ইলিয়াস মোল্লা, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য আবদুত তাওয়াব, জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা বদরউদ্দিন, ফরিদপুর-২ আসনে ১১ দল সমর্থিত প্রার্থী শাহ আকরাম আলী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ফরিদপুরের সভাপতি আমজাদ হুসাইন আশ্রাফী, এনসিপির ফরিদপুর বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক নিজামউদ্দিন এবং জাতীয় যুব শক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম।
সিএ/এমই


