জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের পেছনে খোলা জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে অযত্নে পড়ে আছে দেড় কোটি টাকা মূল্যের একটি অত্যাধুনিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স। মুমূর্ষু রোগীদের জরুরি চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কথা থাকলেও দক্ষ জনবল না থাকায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে সেটি চালু করা যাচ্ছে না। ফলে অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভেতরের মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জামও খোয়া যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, বিশেষায়িত এ অ্যাম্বুলেন্সটি পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত চালক এবং দক্ষ মেডিকেল টেকনিশিয়ান প্রয়োজন। বর্তমানে এই ধরনের জনবল না থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেটি চালু করতে পারছে না। একই সঙ্গে জ্বালানি খরচ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
জামালপুর জেলার প্রায় ২৬ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসা ২৫০ শয্যার জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল। জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ থাকলেও সেটির সঙ্গে কোনো হাসপাতাল সংযুক্ত নেই। ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রায়ই ময়মনসিংহ বা ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠাতে হয়। জামালপুর শহর থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার এবং ঢাকার দূরত্ব প্রায় ১৮০ কিলোমিটার। এসব হাসপাতালে পৌঁছাতে সময় লাগে দুই থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত। এতে অনেক সময় রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে পড়ে এবং পথেই মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।
এই পরিস্থিতিতে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের একটি আধুনিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স উপহার দেওয়া হয়। অ্যাম্বুলেন্সটিতে ভেন্টিলেটর, কার্ডিয়াক মনিটর, সাকশন মেশিন ও অক্সিজেন সাপোর্টসহ উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম রয়েছে। প্রথম কয়েক বছর এটি জরুরি সেবায় ব্যবহৃত হলেও ২০২৪ সাল থেকে তা খোলা জায়গায় পড়ে আছে। ধুলোবালু জমে অ্যাম্বুলেন্সটির অবস্থা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভেতরের কিছু মূল্যবান যন্ত্রপাতিও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত বুধবার দুপুরে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কথা হয় দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ডাংধরা এলাকার কলেজছাত্র রবিউল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁর বাবা অলিউর রহমান হৃদরোগে আক্রান্ত হলে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে আনা হয়। পরে চিকিৎসকেরা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তখন লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে বাধ্য হয়ে অনেক বেশি ভাড়া দিয়ে একটি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে নেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, জেলার ২৬ লাখ মানুষের জন্য এই লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্সটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি মুমূর্ষু রোগীদের নিরাপদে উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু সেটি হাসপাতালের পেছনে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে। অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভেতরের মূল্যবান যন্ত্রপাতিও খোয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মাহফুজুর রহমান সোহান বলেন, বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্সটি পরিচালনার জন্য সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষিত চালক এবং দক্ষ মেডিকেল টেকনিশিয়ান প্রয়োজন, যা বর্তমানে নেই। এছাড়া সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সের তুলনায় এর জ্বালানি খরচও অনেক বেশি। এসব কারণে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে সিভিল সার্জন আজিজুল হক বলেন, অ্যাম্বুলেন্সটি দীর্ঘদিন ব্যবহৃত না হওয়ার বিষয়টি তাদের জানা আছে। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার জন্য একটি নতুন কমিটি গঠন করা হচ্ছে, যার সভাপতি থাকবেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। কমিটি গঠনের পর প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও জ্বালানি ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সিএ/এএ


