পারিবারিক দায়িত্ব, মাতৃত্বকালীন সময় কিংবা সামাজিক ও কর্মপরিবেশগত নানা কারণে অনেক পেশাজীবী নারী চাকরি থেকে বিরতি নিতে বাধ্য হন। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মবিরতিতে যাওয়া নারীদের প্রায় ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশই আবার কর্মজীবনে ফিরতে আগ্রহী। এমন প্রেক্ষাপটে কর্মজীবন থেকে বিরতি নেওয়া নারীদের পুনরায় কাজে ফিরতে সহায়তা করতে ‘ব্রিজ রিটার্নশিপ’ নামে একটি কর্মসূচি চালু করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক।
বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এ উদ্যোগের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। সেখানে জানানো হয়, গত বছর শুরু হওয়া এ কর্মসূচির আওতায় কর্মবিরতিতে থাকা নারীরা ব্র্যাকের বিভিন্ন কর্মসূচিতে ছয় মাস কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি তাঁদের দক্ষতা উন্নয়ন, নেতৃত্ব বিকাশ, মেন্টরিংসহ পেশাগত সক্ষমতা বাড়াতে নানা প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ কর্মসূচিতে ১ হাজার ২০০-এর বেশি নারী আবেদন করেন। কয়েক ধাপের বাছাই শেষে চূড়ান্তভাবে ২৪ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো চালু হওয়া এই কর্মসূচিতে ১৫ জন নারী অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
ব্র্যাকের চিফ পিপল অ্যান্ড কালচার অফিসার মৌটুসী কবীর বলেন, ‘আমরা স্কুল ড্রপআউটের কথা বলি, কিন্তু ক্যারিয়ার ড্রপআউটও হয়। এটি মূলত নারীদেরই বেশি প্রভাবিত করে। ক্যারিয়ার ড্রপআউটের একটি বাস্তব সমাধান (প্র্যাকটিক্যাল সলিউশন) তৈরি করার চিন্তা থেকেই ব্রিজ রিটার্নশিপের পরিকল্পনা।’ তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সময় কর্মবিরতির পর নারীরা আবার চাকরির আবেদন করলে অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের সাক্ষাৎকারে ডাকা হয় না। আবার যাঁদের ডাকা হয়, তাঁদের প্রতি কখনো কখনো বিরূপ মন্তব্য করা হয়, যা তাঁদের নিরুৎসাহিত করে এবং অপমানবোধের সৃষ্টি করে।
মৌটুসী কবীর বলেন, ‘২৪ জন ব্র্যাকে (ব্রিজ রিটার্নশিপ) যোগ দিয়েছেন। এর বাইরেও যাঁরা খুব দক্ষ, সে রকম ১২০ জনের তথ্য আমরা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করব। যাতে (কর্মী) দরকার হলে তারা এই নারীদের বিবেচনা করতে পারে।’ তিনি জানান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক নারীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা দেওয়া হবে।
ব্র্যাকের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, কর্মজীবন থেকে নারীদের বিরতির পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ নারী পারিবারিক দায়িত্ব পালনের কারণে এবং ৩৬ শতাংশ নারী মাতৃত্বকালীন সময়ের কারণে চাকরি ছাড়েন। এ ছাড়া বিরূপ কর্মপরিবেশের কারণে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সামাজিক চাপের কারণে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ নারী চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন।
অন্যদিকে কর্মজীবনে ফিরে আসার পেছনে নারীদের প্রধান অনুপ্রেরণাগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন এবং পরিবারে অবদান রাখার ইচ্ছা। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ নারী অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য এবং ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ নারী পরিবারে অবদান রাখতে আবার কাজে যোগ দিতে চান। তবে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ নারী পেশাগত উন্নয়নকে উল্লেখ করেছেন।
দীর্ঘ বিরতির পর কর্মজীবনে ফেরার পথে নানা প্রতিবন্ধকতার কথাও উঠে আসে অনুষ্ঠানে। এ বছর নির্বাচিত ২৪ জনের একজন জাহরুন জান্নাত জানান, চার বছর চাকরি করার পর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তিনি কর্মবিরতি নেন। দুই বছর পর চাকরিতে ফেরার চেষ্টা করতে গিয়ে নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি। জাহরুন বলেন, ‘বাচ্চার বয়স এক বছর হওয়ার পর থেকে চাকরির চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু কোথাও ডাক পাচ্ছিলাম না। এক জায়গায় সাক্ষাৎকারে আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি বাচ্চা নিয়ে কীভাবে সামাল দেবেন? ব্র্যাকের এই উদ্যোগটি আমার জন্য একটি নতুন শুরু।’
অনুষ্ঠানে একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ২০২৫ সালের ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচি থেকে ব্র্যাকে যোগ দেওয়া এলিজাবেথ মারান্ডী ও ফারাহ মাহবুব। জেন্ডার ইকুয়ালিটি কোয়ালিশনের কমিউনিকেশন ম্যানেজার সেমন্তী মঞ্জরীর সঞ্চালনায় আয়োজিত এ আলোচনার শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন মৌটুসী কবীর এবং ব্র্যাকের এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার নাজিবুল ইসলাম।
সিএ/এমই


