Saturday, March 14, 2026
22.8 C
Dhaka

ত্রিপুরা সমাজের বিয়ে নিয়ে অদ্ভুত যত রীতিনীতি

টিপ্রা কথাটি এসেছে ত্রিপুরা শব্দটি থেকে। বিষ্ণুপুরাণে কিরাত ভূমির উল্লেখ পাওয়া যায়। ত্রিপুরা নামে এক ব্যক্তি ওই কিরাতভূমিতে রাজত্ব করতেন। তাঁর নামানুসারেই ত্রিপুরারাজ্যের নামকরণ হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। ত্রিপুরা ভাষায় টুই অর্থ পানি এবং প্রা অর্থ আধিপত্য। পার্বত্য ত্রিপুরা পূর্বে ছিল পানিদ্বারা বেষ্টিত। এখানে যারা আধিপত্য করত তাদের বলা হতো টুইপ্রা। গবেষকরা মনে করেন এই টুইপ্রা শব্দটিই কালক্রমে রূপান্তরিত হয়ে টিপ্রা হয়েছে।

বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা ছাড়াও কুমিল্লা, সিলেট, চট্টগ্রাম প্রভৃতি স্থানে ত্রিপুরাদের বসবাস রয়েছে। এদের ৩৬টি গোত্রের মধ্যে এ দেশে বসবাস করছে চৌদ্দটির মতো গোত্র। যেমন : দেনদাউ, গাবিঙ,খালি, নাইতুঙ,ফাদুঙ,হারবাঙ, পুরাণ, কেওয়া, ওসই, কেমা, রিয়াং, মাইপালা, আসলং, নবতিয়া। ত্রিপুরা সমাজে পিতার পরিচয়েই সাধারণ সন্তানের বংশ পরিচয় নির্ধারিত হয়। তবে কোনো কোনো গোত্রে মেয়ে সন্তানরা মায়ের বংশ পরিচয়ে পরিচিত হয়।

এদের একই গোত্রে বিয়ে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। গোত্র মিলিয়ে তারা বিয়ের প্রস্তাব উত্থাপন করে থাকে। যেমন : পুরাণ গোত্রের সঙ্গে রিয়াং, রিয়াং গোত্রের সঙ্গে নবতিয়া, নবতিয়া গোত্রের সঙ্গে ওসই, ওসই গোত্রের সঙ্গে পুরাণ, ওসই গোত্রের সঙ্গে নবতিয়া, পুরাণ গোত্রের সঙ্গে নবতিয়া, রিয়াং গোত্রের সঙ্গে পুরাণ, ওসই গোত্রের সঙ্গে রিয়াং। যেসব সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ত্রিপুরা বিয়ে নিষিদ্ধ থাকে সেগুলো হচ্ছে— ১. আপন ভাইবোন; ২. আপন খালা, চাচা-চাচি, মামা-মামি; ৩. আপন খালাতো ভাইবোন, চাচাতো ভাইবোন, মামাতো ভাই বোন এবং ৪. সৎ মা, সৎ ভাইবোন ইত্যাদি।

ত্রিপুরা আদিবাসী সমাজে সাধারণত দুই ধরনের বিয়ে রীতির প্রচলন রয়েছে। যেমন— হিকনানানী বা গন্ধর্ব বিয়ে এবং কাইজগন্নী বা প্রাজাপত্য বিয়ে। এ ছাড়া এদের গোত্রভেদে বিভিন্ন বিয়ে আচারের প্রচলন রয়েছে।

বর-কনে পরস্পরকে ভালোবেসে পছন্দ করে যে বিয়ে করে তাকে হিকনানানী বা গন্ধর্ব বিয়ে বলা হয়। এই বিয়েতে কোনো প্রকার আনুষ্ঠানিকতা বা উৎসবের প্রয়োজন হয় না। পরস্পরকে স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে গ্রহণই একমাত্র আনুষ্ঠানিকতা। তবে বিয়েতে অনেক সময় অভিভাবকদের অনুমতি থাকে না। বিয়ের পর নবদম্পতিকে সমাজে ফিরতে হলে গ্রাম প্রধানের অনুমতি নিয়ে একটি ভোজের আয়োজন করতে হয়। তবে সবার জন্য এই ভোজের বাধ্যবাধকতা নেই।

আবার পারিবারিকভাবে অভিভাবকদের পছন্দ অনুযায়ী পাত্রপাত্রী নির্বাচনপূর্বক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে নানা রকম সামাজিক অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে কাইজগন্নী বা প্রাজাপত্য বিয়ে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। আদিতে অভিভাবকের মাধ্যমে বর-কনে ঠিক হয়ে গেলে নির্দিষ্ট একটি দিনে বরের কয়েকজন বন্ধু বরকে দুবোতল মদ ও কিছু পান-সুপারিসহ শ্বশুড়বাড়িতে রেখে আসত। ওখানে বর দুবছরের জন্য শ্বশুড় পরিবারের সদস্য হিসেবেই থেকে যেত। এ সময় তাকে জমিতে কাজকর্ম করে প্রমাণ করতে হতো ভবিষ্যতে সংসারজীবনে সে সমর্থ কি না। শ্বশুড়বাড়ি থাকাকালীন তারা স্বামী-স্ত্রীরূপে থাকার অধিকার পেত। কিন্তু বর্তমানে ত্রিপুরা সমাজে এ বিয়ে প্রথার প্রচলন একেবারেই দেখা যায় না।

বর যদি কনে পক্ষের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য নিয়ে কনের বাড়িতেই বিয়ে সম্পন্ন করে এবং ঘরজামাই হিসেবে শ্বশুড়বাড়িতে বসবাস করে তবে ওই বিয়েকে কাইজালাই কুসুর বিয়ে বলে। আবার কোনো কনে বিয়েতে রাজি না হলেও জোরপূর্বক তাকে তুলে এনে তিনজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে যে বিয়ে সম্পন্ন হয়, সেটিও কাইজালাই কুসুর বিয়ে। তবে আধুনিক ত্রিপুরা সমাজে এ ধরনের বিয়েরও এখন তেমন প্রচলন নেই।

ত্রিপুরা সমাজে বিয়ে রীতিতে ঘটকের মাধ্যমে প্রাথমিক আলোচনা করা হয়। এরপর বরপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দেওয়ার জন্য দুবোতল মদ, এক জোড়া নারকেল, এক পণ সুপারি, দুই বিড়া পান সঙ্গে নিয়ে কনের বাড়ি যেতে হয়। কনে পাড়ার মুরুব্বীদের জন্যও এক বোতল মদ সম্মানী হিসেবে নেওয়া হয়। কিন্তু এ সময় বরপক্ষ সরাসরি কোনো বিয়ের প্রস্তাব তুলে না। কনেপক্ষও সরাসরি সম্মতি বা অসম্মতি প্রকাশ করে না। সব কথাই হয় রূপক অর্থে। বরপক্ষের প্রস্তাবে মেয়ের বাবা সম্মতি প্রকাশ করলে বরপক্ষকে দ্বিতীয়বার আরো বেশি পরিমাণ মদ ও উপহার নিয়ে কনেপক্ষের বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়। ওইদিন বিয়ের দিনক্ষণ ও পণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সব বিষয়ে আলোচনা করে নেয় ত্রিপুরা আদিবাসীরা।

বিয়ের দিন কনেবাড়ি যাত্রার আগে কাথারক দেবতার পূজা ও ভোগ দেয় এরা। এ পূজার আচার হিসেবে বরের বাড়ির উঠানে বাঁশের বেদী সাজিয়ে সেখানে একটি মোরগ ও একটি মুরগি বলি দিয়ে দেবতার আশীর্বাদ নিয়ে যাত্রা শুরু করা হয়। কনে বাড়িতে পৌঁছানোর পর কনেপক্ষের যুবতী ও কিশোরীরা মাথায় বোতল ও প্রদীপ জ্বেলে ভরা কলসির ওপর থালায় দাঁড়িয়ে নানা ভঙ্গিমায় কাথারক নৃত্য পরিবেশন করে। অতঃপর একটি কুলায় ঘট বসিয়ে তাতে প্রদীপ জ্বালিয়ে হাত পাখার বাতাস দিতে দিতে কনের বাবা-মা বরযাত্রীদের বরণ করে ঘরে তোলেন। অতঃপর কনের জন্য আনা বিয়ের কাপড় ও জিনিসপত্র সবার সামনে খোলা হয় এবং সবার আশীর্বাদ নেওয়া হয়।

বিয়েতে কনের বাড়ি ও দরজার দুই পাশে দুটি কলাগাছ পুঁতে দুটি ঘটে আমপাতা ও সিঁদুর এবং নানা রঙের কাগজের ঝালর কেটে সাজানো হয়। একইভাবে সাজানো হয় গেট ও মণ্ডপ। এরপর বিয়ের বেদীতে বসানো হয় বরকনেকে। কনে বসে বরের বামদিকে। বিয়ের কাজ সম্পাদনের দায়িত্ব থাকে একজন বিশুদ্ধ নারীর। যিনি বিয়ের আগে বিশুদ্ধ যুবতী ছিলেন এবং বিয়ের পর বিধবা হননি। এ ছাড়া বিয়েতে দুজন বালককে বরের সঙ্গে এবং দুজন বালিকাকে কনের পাশে বসানো হয়। তাদের সামনে রাখা হয় আমপাতায় সিঁদুর দেওয়া জলভরা ঘট, কিছু চাল ও কার্পাস তুলা, অচাই বা পুরোহিতের জন্য এক বোতল মদ। একটি পাত্রে থাকে ভাতের দলা ও রান্না করা দুটি মুরগির রান। এ ছাড়া বর-কনের সামনে দুটি বাঁশের চোঙায় একটিতে পানি ও অপরটিতে মদ রাখা হয়।

প্রথমে বরকনেকে একটি চাদরে মুড়িয়ে দেওয়া হয়। পুরোহিত লামপ্রা দেবতার উদ্দেশে মোরগ ও হাঁস বলি দিয়ে শুরু করেন বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর তিনি চাল ও তুলা হাতে চোঙা থেকে সামান্য পানি নিয়ে চন্দ্র, সূর্য, গঙ্গা ও বসুমতিকে স্মরণ করে সবাইকে সাক্ষী রেখে সাত পাক ঘুরিয়ে পানি, চাল ও তুলা বর-কনের মাথার ওপর ছিটিয়ে দেন। ত্রিপুরারা বিশ্বাস করে বর-কনের বিয়েতে যদি কোনো বাধা-বিপত্তি থাকে তবে ওই আচারের মাধ্যমে তা দূর হয়ে যায়। অতঃপর বরের কোলে কনেকে বসানো হয়। পুরোহিত তখন উভয়ের দীর্ঘায়ু ও সুখী হওয়ার জন্য দ্বিতীয়বার পানি, চাল ও তুলা তাদের মাথায় ছিটিয়ে দেন এবং পিতামাতার নাম উল্লেখ করে বরকনের দুদিকের চাদরের কোণা একত্রে বেঁধে দেন। তখন উপস্থিত প্রবীণদের মধ্য থেকে তিন বা সাতজন চাল ও তুলা হাতে তাদের আশীর্বাদ করলেই বিয়ের আনুষ্ঠানিক কাজ সমাপ্ত বলে ধরে নেওয়া হয়। সাথে সাথেই বরকে কনের কপালে ও সিঁথিতে সিঁদুর দিতে হয়। অতঃপর কনে মদের অর্ধেক পান করার পর বাকি অর্ধেক বরকে পান করিয়ে দেয়। আনুষ্ঠানিকতা শেষে নব দম্পতি সবার সামনে তাদের ভোজন পর্ব শেষ করে এবং সবার আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। এ পর্বটিকে ত্রিপুরারা যাগ সংগীই মাই চানাই বলে থাকে।

spot_img

আরও পড়ুন

ডায়াবেটিসে ক্ষুদ্র রক্তনালির ক্ষতি কেন হয়

অনেকেই মনে করেন ডায়াবেটিস মানেই শুধু রক্তে শর্করার মাত্রা...

৩০ হাজার টাকার মধ্যে ঈদের সেরা স্মার্টফোন

ঈদকে সামনে রেখে প্রযুক্তিপ্রেমীদের মধ্যে নতুন স্মার্টফোন কেনার আগ্রহ...

রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করে নতুন নির্বাচন দাবি নাহিদের

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ফ্যাসিস্টের দোসর আখ্যা দিয়ে তাকে অভিশংসনের...

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বার নির্বাচনে ব্যালট বিতর্কে থেমে গেল গণনা

ব্যালটপত্রে ত্রুটির অভিযোগ ওঠার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির...

সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ থাকায় বাড়ছে মাদক ও পণ্য চোরাচালান

মিয়ানমারের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দর প্রায়...

রামপালে ভয়াবহ দুর্ঘটনা: বর-কনেসহ ১৪ জন নিহত

বাগেরহাটের রামপালে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বর-কনেসহ ১৪ জনের...

নগরের সৌন্দর্য রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে শুভেচ্ছা জানানোর নামে ব্যানার,...

প্লাস্টিকমুক্ত শহর গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে

নারায়ণগঞ্জে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আয়োজন...

বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহ বিবেচনায়

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ অতিরিক্ত...

পারিবারিক কলহে গৃহবধূ হত্যা, স্বামী পলাতক

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার হরণী ইউনিয়নের আল-আমিন গ্রামের একটি বাড়ি...

রহস্যময় ওরফিশ নিয়ে নতুন আলোচনা

মেক্সিকোর কাবো সান লুকাসের একটি সৈকতে সম্প্রতি বিরল প্রজাতির...

ডিপিওয়ার্ল্ডের চুক্তি এগিয়ে নিতে বাধা নেই

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানি...

পুলিশের ঈদ যাত্রা নিরাপত্তা নির্দেশনা

আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে...

রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের গুরুত্ব

ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের মধ্যে ইতিকাফ একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক অনুশীলন।...
spot_img

আরও পড়ুন

ডায়াবেটিসে ক্ষুদ্র রক্তনালির ক্ষতি কেন হয়

অনেকেই মনে করেন ডায়াবেটিস মানেই শুধু রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়া। তবে বাস্তবে এটি একটি রক্তনালিভিত্তিক রোগ, যা ধীরে ধীরে শরীরের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত...

৩০ হাজার টাকার মধ্যে ঈদের সেরা স্মার্টফোন

ঈদকে সামনে রেখে প্রযুক্তিপ্রেমীদের মধ্যে নতুন স্মার্টফোন কেনার আগ্রহ বাড়ে। অনেকে নিজের জন্য নতুন ফোন কেনেন, আবার অনেকে প্রিয়জনকে উপহার দিতেও স্মার্টফোন বেছে নেন।...

রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করে নতুন নির্বাচন দাবি নাহিদের

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ফ্যাসিস্টের দোসর আখ্যা দিয়ে তাকে অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ করে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের...

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বার নির্বাচনে ব্যালট বিতর্কে থেমে গেল গণনা

ব্যালটপত্রে ত্রুটির অভিযোগ ওঠার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন গণনার মাঝপথে স্থগিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) রাত পৌনে ১০টার দিকে...
spot_img