বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধানে ডিএনএকে দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে নির্ভুল প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অপরাধ তদন্ত থেকে শুরু করে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণ—সব ক্ষেত্রেই ডিএনএ পরীক্ষাকে ধরা হয় চূড়ান্ত সত্য হিসেবে। তবে বাস্তব জীবনের এক ঘটনা দেখিয়েছে, প্রকৃতির জটিলতায় কখনও কখনও এই পরীক্ষাও বিভ্রান্তিকর ফল দিতে পারে।
লিজ বার্নোর লেখা বই হিডেন গেস্টস-এ উঠে এসেছে এমনই এক অভাবনীয় কাহিনি। সেখানে লিডিয়া নামের এক নারীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে, যিনি মাত্র ২৬ বছর বয়সে একা হাতে দুই সন্তান লালন-পালন করছিলেন। সরকারি ভাতার জন্য আবেদন করার পর নিয়ম অনুযায়ী তাঁর মাতৃত্ব যাচাইয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। ফলাফল আসে বিস্ময়কর—ডিএনএ অনুযায়ী তিনি নাকি ওই দুই সন্তানের মা নন।
সমাজসেবা বিভাগের কর্মকর্তারা তাঁকে জানান, ডিএনএ পরীক্ষায় শতভাগ নির্ভুল ফল আসে। ফলে সন্দেহের তীর ঘুরে যায় লিডিয়ার দিকেই। তদন্তকারীরা ধারণা করেন, তিনি হয়তো অন্য কারও সন্তান নিজের বলে দাবি করছেন। লিডিয়া তাঁর গর্ভাবস্থার ছবি দেখান, পরিবারের সদস্য ও চিকিৎসকের সাক্ষ্যও উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ায় মুখের কথার চেয়ে প্রাধান্য পায় ডিএনএ রিপোর্ট।
মামলা চলাকালে লিডিয়া তৃতীয়বারের মতো গর্ভবতী ছিলেন। আদালতের নির্দেশে সন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই অপারেশন থিয়েটারে মা ও নবজাতকের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু ফলাফল আগের মতোই—সদ্য জন্ম নেওয়া সন্তানটির সঙ্গেও লিডিয়ার জেনেটিক মিল পাওয়া যায়নি। এতে চিকিৎসক ও বিচারকদের মধ্যেও বিস্ময় সৃষ্টি হয়।
অবশেষে আইনজীবী অ্যালান টিন্ডেল বিষয়টি গভীরভাবে অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেন। বোস্টনের একদল গবেষকের সহায়তায় লিডিয়ার শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে কোষের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। রক্ত, চুল, ত্বক—কোনো কিছুর ডিএনএ-তেই সন্তানের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। পরে জরায়ুমুখ থেকে নেওয়া কোষে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দেখা যায়, তাঁর শরীরে দুই ধরনের আলাদা ডিএনএ বিদ্যমান।
গবেষকেরা জানান, লিডিয়া ভ্রূণ অবস্থায় তাঁর যমজ বোনের ভ্রূণকে নিজের মধ্যে শোষণ করেছিলেন। ফলে তিনি জন্ম নেন এক ব্যক্তি হিসেবে, কিন্তু শরীরে বহন করতে থাকেন দুই ভিন্ন ডিএনএ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে বলা হয় মাইক্রোকাইমেরিজম। অর্থাৎ, তাঁর সন্তানেরা জেনেটিকভাবে সেই অদৃশ্য যমজের সন্তান হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছিল।
এ ধরনের ঘটনা একক নয়। যুক্তরাষ্ট্রে আইভিএফ পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়া এক শিশুর পিতৃত্ব পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জেনেটিকভাবে শিশুটির বাবা নন, বরং চাচা। পরে জানা যায়, তাঁর শরীরেও হারিয়ে যাওয়া যমজের ডিএনএ বিদ্যমান ছিল, যা পরীক্ষার ফলকে বিভ্রান্ত করেছিল।
এই ঘটনাগুলো দেখায়, ডিএনএ পরীক্ষা অত্যন্ত নির্ভুল হলেও প্রকৃতির জটিলতায় ব্যতিক্রম ঘটতে পারে। বিজ্ঞান নিজেকে সংশোধনের সুযোগ রাখে—এটাই তার শক্তি।
সিএ/এমআর


