রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রথম আলো ভবন ঘিরে আয়োজিত ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’ ঘিরে দর্শনার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে। শুক্রবার ( ৫ ডিসেম্বর) বিকেলেও বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষ প্রদর্শনীটি দেখতে আসেন। আয়োজকেরা জানান, আজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দর্শনার্থীদের আগ্রহের কারণে প্রদর্শনীর সময় দুই দিন বাড়ানো হয়েছে। এটি চলবে আগামী ২ মার্চ পর্যন্ত।
অগ্নিদগ্ধ ও আক্রান্ত ভবনের ভেতরে আয়োজিত এই প্রদর্শনী ঘিরে আলোচনা তৈরি হয়েছে শিল্প ও গণমাধ্যম অঙ্গনে। দশম দিনে বিকেলে প্রদর্শনী পরিদর্শনে আসেন মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। প্রদর্শনী ঘুরে দেখে হামিদা হোসেন বলেন, যারা হামলা করেছে, তারা সাংঘাতিক খারাপ কাজ করেছে। এটা সবাইকে দেখানো দরকার।
এর আগে সকালে প্রদর্শনীতে আসেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ নিয়ে লেখালেখি করছেন। প্রদর্শনী দেখে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তিনি লিখেছেন, ভারতবিরোধী ও মুক্ত গণমাধ্যমবিরোধী উগ্রপন্থীদের অগ্নিসংযোগের শিকার হওয়া ভবনের ভেতরে প্রদর্শনীর আয়োজন করার সিদ্ধান্তটি একই সঙ্গে সাহসী ও অনুপ্রেরণামূলক। যাঁর মাথায় এই পরিকল্পনা এসেছে, তিনি সর্বোচ্চ প্রশংসার দাবিদার। আর যে শিল্পী এটিকে প্রাণ দিয়েছেন, তিনি জোরালো স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য।
মবকে শুরুতেই থামিয়ে দিতে হবে
গুলশান সোসাইটির সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ওমর সাদাত প্রদর্শনীতে এসে বলেন, ‘যখন প্রথম আলোর ভবন পুড়ছিল, তখন মনে হচ্ছিল, আমি পুড়ছি, নিজের ভেতরে দহনটা আমি অনুভব করছিলাম।’ তিনি এ হামলাকে চিন্তা ও বাক্স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সব ধরনের মবকে শুরুতেই থামিয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি সবার বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
শিল্পী মাহ্বুবুর রহমানের ‘আলো’ শিরোনামের এই প্রদর্শনী প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত। প্রকৌশলী কাজী জাহিদুল হাসান প্রদর্শনী ঘুরে দেখে বলেন, এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে সেই রাতের ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে। শিল্প–প্রদর্শনীর মাধ্যমে এ ঘটনা সবার মধ্যে ছড়িয়ে গেছে।
জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার হামলা–ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে ‘অচিন্তনীয়’ বলে উল্লেখ করে বলেন, প্রদর্শনী না দেখলে হামলার ভয়াবহতা বোঝা যেত না। গণমাধ্যমের ওপর এ ধরনের আঘাত সভ্য সমাজে চলতে পারে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক শওকত হোসেন ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে এই শিল্পকর্ম আয়োজনের প্রশংসা করে বলেন, আক্রান্ত হওয়ার এক দিন পর পত্রিকা প্রকাশ করা একটি বড় অর্জন।
আজকের পত্রিকার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মোহাম্মদ শফিউল্লাহ প্রদর্শনী দেখে বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই হামলা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার ছন্দপতন।
প্রথম আলো বাংলাদেশেরই কণ্ঠস্বর
লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেন সেলিম বিকেলে ছেলে মেহেদী হাসানকে নিয়ে প্রদর্শনীতে আসেন। প্রদর্শনী দেখে তিনি বলেন, প্রথম আলোর ওপর হামলা বাংলাদেশের ওপর হামলা। প্রথম আলো বাংলাদেশেরই কণ্ঠস্বর। এভাবে হামলা করে প্রথম আলোকে থামানো যাবে না।
উত্তরা থেকে আসা প্রকৌশলী রোকসানা মহসিন সুমি ও প্রকৌশলী নাফিস আহমেদ দম্পতি প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। রোকসানা মহসিন বলেন, ‘এখানে এসে বুঝতে পারছি যে কী হয়েছে, হামলার ভয়াবহতা কেমন।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রহ্লাদ দেবনাথ ছেলে জয়দীপ দেবনাথকে নিয়ে প্রদর্শনী দেখতে এসে বলেন, এখানে এসে হামলার ভয়াবহতা, নৃশংসতা উপলব্ধি করেছি তখন আসলে অবস্থা কেমন ছিল। ভবন পুড়িয়ে দেওয়ার এক দিন পর ছাপা পত্রিকা হাতে পেয়ে তিনি ভীষণ আনন্দিত হয়েছেন বলে জানান।
এখনো পোড়া গন্ধ
হামলার শিকার ভবনে প্রবেশ করতেই এখনো পোড়া গন্ধ অনুভূত হয়। প্রবেশপথের বাঁ দিকে রয়েছে একাধিক চিত্রকর্ম। একটি চিত্রে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া ভবনের অবয়ব ফুটে উঠেছে। আরেকটিতে দেখা যায় পোড়া ভবনের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি। চিত্রকর্ম ও স্থাপত্যের পাশাপাশি সেখানে রাখা হয়েছে পুড়ে যাওয়া কম্পিউটারসামগ্রী ও আসবাবপত্র।
দোতলায় আগুনে পোড়া বই প্রদর্শন করা হয়েছে। যেসব বই আগুনে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়নি, সেগুলোকেও রাখা হয়েছে আলাদা প্রদর্শনীতে। অক্ষত বইয়ের প্রদর্শনীতে লেখা রয়েছে, ‘এই মহাসাগরে স্নান করে জাগোরে’। ধ্বংসস্তূপের ওপর প্রতীকীভাবে রাখা হয়েছে সাদা কফিন।
তৃতীয় তলায় প্রদর্শন করা হচ্ছে পুড়ে যাওয়া লোহালক্কড়, বৈদ্যুতিক তার ও অন্যান্য উপকরণ। হামলার সময় ভবনে উপস্থিত কর্মীদের বক্তব্যও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
চতুর্থ তলায় হামলার ভিডিও চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। পাশাপাশি উগ্রবাদীদের লুটপাট ও ভাঙচুরের চিহ্ন, এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে থাকা সামগ্রী এবং প্রতীকীভাবে রাখা একঝাঁক কবুতর দর্শকদের সামনে সেই রাতের স্মৃতি উন্মোচন করছে।
সিএ/এমই


