শিক্ষার মূল লক্ষ্য সৎ, দক্ষ ও মানবিক নাগরিক গড়ে তোলা। শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে, অজ্ঞতা ও অন্ধকার দূর করে—এমন ধারণাই দীর্ঘদিন ধরে সমাজে প্রতিষ্ঠিত। সেই কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বলা হয় মানুষ গড়ার কারখানা। তবে যে প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করবে, সেখানেই যদি অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে উচ্চশিক্ষার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আইন অনুযায়ী এগুলো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু বিভিন্ন সময় একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আর্থিক, প্রশাসনিক ও একাডেমিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে অর্থ বাণিজ্য, সনদ নিয়ে কারসাজি এবং তহবিল ব্যবহারে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ সামনে এসেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) পাঁচ বছর আগে ২৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে নামে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এর মধ্যে মাত্র তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে অভিযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। বাকিগুলোর তদন্ত অগ্রগতি নিয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
চট্টগ্রামের সাউদার্ন ইউনিভার্সিটিকে ঘিরে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পর গত বছরের মে মাসে সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রতিষ্ঠানটিতে সনদ নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগও ওঠে। ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল নিয়মবহির্ভূতভাবে উপাচার্য অধ্যাপক ইঞ্জিনিয়ার মো. মোজাম্মেল হককে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ শরীফ আশরাফুজ্জামানকে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য করা হয়। তার বিরুদ্ধেও সনদ জালিয়াতিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন।
নিয়ম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতি ভিসি নিয়োগ বা অপসারণের ক্ষমতা রাখেন। একই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা-১ জানায়, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় মোজাম্মেল হক স্বপদে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টি (বিওটি) ওই নির্দেশ মানেনি।
পরে বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য সচিব সরওয়ার জাহান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করেন। আদালত আদেশ স্থগিত করেন। এরপর আপিল বিভাগে সিভিল পিটিশন দায়ের করেন অধ্যাপক মোজাম্মেল হক। গত ৪ ডিসেম্বর শুনানি শেষে আদালত সাময়িক অব্যাহতি আদেশের আইনি ভিত্তি না থাকায় তা তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরবর্তীতে বিওটির সদস্য সচিব সরওয়ার জাহান ও সদস্য ইসরাত জাহানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে দুদক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেন মোজাম্মেল হক। শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিযোগ আমলে নিয়ে ইউজিসিকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। ইউজিসি চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।
শুধু সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি নয়, আরও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধেও গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগে শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের কার্যক্রম খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ রয়েছে, বিধিবিধান লঙ্ঘন করে প্রতিষ্ঠানের ফান্ডের ৩৪৩ কোটি ৬০ লাখ ৩০ হাজার ৪৯৯ টাকা শান্ত-মারিয়াম ফাউন্ডেশনে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং ১০২ কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। ইউজিসি জানিয়েছে, দেশের ২০ থেকে ৩০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিওটির বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও তহবিল তছরুপের মতো অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিওটি ভেঙে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রয়েছে।
এদিকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তর না করা, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি, নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রশাসনিক পদে নিয়োগ—এসব কারণে ১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ইউজিসির কর্মকর্তারা।
ঢাকার বাইরে বরিশালসহ বিভিন্ন বিভাগে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বরিশালে প্রতিষ্ঠিত গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, গ্লোবাল ভিলেজ ও ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির কার্যক্রম এখনো ভাড়া ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। স্থায়ী ক্যাম্পাসে না যাওয়ায় গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির জানুয়ারি সেমিস্টারে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে ইউজিসি। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় ধরে সেশন পরিচালিত হচ্ছে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
সমালোচকরা বলছেন, উচ্চশিক্ষার প্রসারের নামে যোগ্যতা ও সক্ষমতা যাচাই ছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেওয়ার সংস্কৃতি সমস্যাকে বাড়িয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার প্রবণতা উচ্চশিক্ষার মান ও সুশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে একের পর এক অভিযোগ ও তদন্তের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—উচ্চশিক্ষা কি তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছে।
সিএ/এএ


