রাসায়নিক দূষণের প্রভাব অনেক সময় চোখে দেখা যায় না বা গন্ধে বোঝা সম্ভব হয় না। তবে কিছু দূষণকারী উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। সম্প্রতি নেচার কমিউনিকেশনস জার্নালে প্রকাশিত অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস সিডনির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ফরএভার কেমিক্যাল বা পিফাস নামের বিষ খাদ্যশৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে ক্রমান্বয়ে ঘনীভূত হচ্ছে।
গবেষণায় বলা হয়, যখন একটি প্রাণী অন্য প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে, তখন ওই রাসায়নিকের মাত্রা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। পিফাস এমন একধরনের রাসায়নিক, যা রান্নার সরঞ্জাম, খাবারের প্যাকেজিংসহ দৈনন্দিন জীবনের নানা পণ্যে ব্যবহৃত হয়। শিল্পকারখানার বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনের মাধ্যমে এই রাসায়নিক প্রথমে নদী, হ্রদ ও সমুদ্রের পানিতে মিশে যায়।
পানিতে থাকা শেওলা ও প্ল্যাঙ্কটন এই রাসায়নিক শোষণ করে। পরে ছোট মাছ এগুলো খেলে বিষ তাদের শরীরে জমা হয়। আবার বড় মাছ যখন একাধিক ছোট মাছ খায়, তখন ছোট মাছগুলোর শরীরে জমে থাকা বিষ বড় মাছের শরীরে একত্রিত হয়। এই রাসায়নিক সহজে শরীর থেকে বের হয় না বা ভেঙে যায় না, ফলে ধীরে ধীরে বিষের মাত্রা বেড়েই চলে।
গবেষণার প্রধান গবেষক লোরেঞ্জো রিকলফি জানান, খাদ্যশৃঙ্খলের প্রতিটি উচ্চতর স্তরে পিফাসের ঘনত্ব গড়ে দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে থাকা বড় মাছ, সামুদ্রিক পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীরা নিয়মিত শিকার করার ফলে তাদের শরীরে এই বিষের মাত্রা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, পরিবেশে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক কম হলেও খাদ্যশৃঙ্খলের প্রক্রিয়ায় শীর্ষ পর্যায়ের প্রাণীরা অস্বাভাবিক মাত্রায় বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছে। মানুষ যেহেতু মাছ ও অন্যান্য প্রাণী খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে, তাই এই রাসায়নিক সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
গবেষকেরা বিশ্বজুড়ে পরিচালিত ৬৪টি পৃথক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এতে ১১৯টি ভিন্ন খাদ্যশৃঙ্খল ও ৭২ ধরনের পিফাস যৌগ অন্তর্ভুক্ত ছিল। জলজ ও স্থলজ উভয় বাস্তুসংস্থানেই একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি যেসব এলাকায় মাটি বা পানির দূষণ তুলনামূলক কম, সেখানেও খাদ্যশৃঙ্খলের উচ্চ স্তরের প্রাণীদের শরীরে বিপজ্জনক মাত্রার রাসায়নিক পাওয়া গেছে। গবেষকেরা এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন।
সিএ/এমআর


