ভোলার উপকূলীয় চরাঞ্চলে শীতের চিরচেনা রূপ বদলে যাচ্ছে। এক সময় দিগন্তজোড়া জলরাশিতে হাজার হাজার অতিথি পাখির জলকেলি ও কিচিরমিচির শব্দে মুখর থাকত চরগুলো।
এখন সেখানে শোনা যাচ্ছে যান্ত্রিক নৌযানের শব্দ ও মানুষের কোলাহল। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা ভোলার উপকূলীয় বিচরণভূমি ক্রমেই পরিযায়ী পাখিদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে। মানুষের সৃষ্ট বহুমুখী চাপের কারণে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমছে অতিথি পাখির সংখ্যা, বদলাচ্ছে তাদের আবাসস্থল। এর ফলে শীতকালীন উপকূলীয় পরিবেশ যেমন তার সৌন্দর্য হারাচ্ছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রকৃতির ভারসাম্য।
চর কুকরী মুকরী, ঢালচর ও মনপুরাসহ ভোলার বিভিন্ন ডুবোচরে এক সময় শীত মৌসুমে অতিথি পাখিদের ডানা মেলা, দলবেঁধে খাবার সংগ্রহ আর জলকেলি ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, চর কুকরী মুকরী, চর শাহজালাল, চর শাজাহান, চর পিয়াল, আইলউদ্দিন চর, চরনিজাম, দমার চর, ডেগরারচরসহ মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যবর্তী প্রায় অর্ধশত নতুন চর ছিল পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সাইবেরিয়া ও হিমালয় অঞ্চল থেকে শীত এড়াতে আসা এসব পাখির কলতানে মুখর থাকত পুরো উপকূল। তবে মানুষের বসতি স্থাপন, কৃষি আবাদ বৃদ্ধি, পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ও গোচারণভূমি হিসেবে চর ব্যবহারের ফলে সেই চিত্র এখন প্রায় হারিয়ে গেছে।
চর কুকরী মুকরির বাসিন্দা নিয়ামুল মাঝি ও তাড়ুয়ার ব্যবসায়ী মিজান খান জানান, দিনরাত যান্ত্রিক নৌযানের শব্দদূষণ ও মানুষের অযাচিত উপস্থিতির কারণে পাখিরা আর আগের মতো চরে ভিড়ছে না।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের রিসার্চ কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ড. সায়াম ইউ. চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল গত ১১ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় পাখি শুমারি চালায়। জরিপে মেঘনা মোহনার ৫৩টি চরে ৬৩ প্রজাতির মোট ৪৭ হাজার ১৫৭টি জলপাখির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ইউরেশিয়ান উইজিয়ন—৬ হাজার ১২টি। এছাড়া ব্ল্যাক-টেইলড গডউইট ৪ হাজার ৪৩৪টি এবং লেসার স্যান্ড প্লোভার ৩ হাজার ৯৬২টি শনাক্ত করা হয়েছে।
জরিপে দেখা যায়, ভোলার মনপুরার কাছে চর আতাউর, ভাসান চরের পাশে জৈজ্জার চর ও আন্ডার চরে জলপাখির ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি। চর আতাউরে ৬ হাজার ৪৭৯টি, জৈজ্জার চরে ৫ হাজার ৮১৪টি এবং আন্ডার চরে ৪ হাজার ৯৮৭টি পাখি রেকর্ড করা হয়েছে। সংগৃহীত তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে শিগগিরই বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে শুমারি দল।
পাখি শুমারি দলের সদস্য এম এ মুহিত জানান, এক সময় ভোলার উপকূলে বার-হেডেড গুজ বা রাজহাঁস হাজারের বেশি দেখা গেলেও এ বছর তা নেমে এসেছে মাত্র ২০–২৫টিতে। খয়রা চখাচখি ও গাঙচষা পাখির সংখ্যাও হাজার থেকে নেমে এসেছে শতকে। এমনকি আগে নিয়মিত দেখা যাওয়া হাড়গিলা পাখির একটিও এবারের শুমারিতে পাওয়া যায়নি। এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, উপকূলীয় বাস্তুসংস্থান পাখিদের বসবাসের উপযোগিতা হারাচ্ছে।
শুমারি দলের সদস্য নাজিম উদ্দিন প্রিন্স বলেন, প্রায় ৫০০ কিলোমিটার নৌপথ পাড়ি দিয়ে এই জরিপ চালানো হয়েছে। পাখি শিকারিদের উপদ্রবের পাশাপাশি বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে তরমুজ চাষ নতুন হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে, যা পাখিদের বিচরণভূমি সংকুচিত করছে।
বন অধিদফতরের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা ফা-তু-জো খালেক মিলা জানান, জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত কাদাজলের চরগুলো পরিযায়ী পাখিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানুষের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড ও অবাধ যাতায়াত বেড়ে যাওয়ায় পাখিরা এলাকা ছাড়ছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এসব চরে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণে শিগগিরই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিএ/এসএ


