ভারতে দেশীয় কুকুরকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক ও নীতিগত অবস্থানের প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের একাধিক নির্দেশনা নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। উপনিবেশিক মানসিকতার প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে দেশীয় ঐতিহ্য ও বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি এই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
গত বছরের নভেম্বর মাসে দেওয়া রামনাথ গোয়েঙ্কা বক্তৃতায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ভারতীয়দের উচিত পশ্চিমা মানসিকতার ওপর চূড়ান্তভাবে ইতি টানার অঙ্গীকার করা। তিনি এই মানসিকতার উৎপত্তি খুঁজে পান ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে, বিশেষ করে ১৮৩৫ সালে ভারতের সুপ্রিম কাউন্সিলের আইন সদস্য টমাস ম্যাকাওলের শিক্ষা পরিকল্পনার মধ্যে। মোদির মতে, ওই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল ভারতের নিজস্ব জ্ঞান ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে উপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ম্যাকাওলে ভারতীয়দের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে হীনমন্যতা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, যার প্রভাব স্বাধীনতার বহু বছর পরও শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক আকাঙ্ক্ষায় রয়ে গেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যে জাতি নিজেকে সম্মান করতে শেখে না, শেষ পর্যন্ত সে নিজের দেশীয় ব্যবস্থা ও সম্ভাবনাকেই প্রত্যাখ্যান করে।
এই বক্তব্যের বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে ভারতীয় সমাজে দেশীয় কুকুরদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি। ব্রিটিশ শাসনামলে ল্যাব্রাডর, জার্মান শেফার্ড কিংবা বিগলের মতো বিদেশি কুকুরের প্রচলনের পর ধীরে ধীরে দেশীয় কুকুরদের অবহেলা শুরু হয়। আজও সামাজিক বাস্তবতায় দেখা যায়, শিক্ষিত ভারতীয়রা সহজেই বিদেশি কুকুরের জাতের নাম বলতে পারলেও দেশীয় কুকুরের জাতের নাম বলতে গিয়ে দ্বিধায় পড়েন।
শিক্ষা, পোশাক, ভাষা বা পেশাগত স্বপ্নের মতোই কুকুর পালনের ক্ষেত্রেও বিদেশি সংস্কৃতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দেশীয় কুকুরদের স্ট্রে বা পথকুকুর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, আর ইউরোপীয় জাতের কুকুরকে সামাজিক মর্যাদা ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বলিউডেও এই মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায়, যেখানে ধনী ও অভিজাত চরিত্রের সঙ্গে প্রায়শই বিদেশি কুকুরকে যুক্ত করা হয়েছে।
তবে এই আলোচনা বিদেশি কুকুরদের বিরুদ্ধে নয়। তারাও অবৈধ প্রজনন, পরিত্যাগ ও নির্যাতনের শিকার। সমালোচনার মূল লক্ষ্য সেই মানসিকতা, যেখানে দেশীয় সবকিছুকে তুচ্ছ করে ইউরোপীয় সংস্কৃতিকেই শ্রেষ্ঠ হিসেবে দেখা হয়। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও নির্যাতনের পর দেশীয় কুকুরদের ঘর ও রাস্তাঘাট থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা অনেকের কাছে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২০ সালে মন কি বাত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদি দেশীয় প্রজাতির কুকুর দত্তক নেওয়ার আহ্বান জানান এবং একে আত্মনির্ভর ভারত গড়ার অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি মুধোল হাউন্ড, হিমাচলি হাউন্ড, রাজাপালায়াম, কন্নি, চিপ্পিপাড়াই ও কোম্বাইয়ের মতো কুকুরের কথা উল্লেখ করে বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলা, উদ্ধার অভিযান ও নিরাপত্তার কাজে এসব কুকুর দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে আবারও মন কি বাত অনুষ্ঠানে তিনি জানান, দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ক্রমশ দেশীয় কুকুরদের কাজে লাগাচ্ছে। এর আগেই গত বছরের ১১ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের পথকুকুরদের আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ ঘিরে দেশজুড়ে প্রতিবাদের সময় আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এটি কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না এবং উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, যখন প্রধানমন্ত্রী ও আরএসএস প্রধান উভয়েই দেশীয় কুকুরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তখন দিল্লির বিজেপি সরকার ও কিছু নেতা কেন বিপরীত পথে হাঁটছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বন্দ্ব শুধু নীতিগত নয়, বরং ভারতের আত্মপরিচয়, আত্মসম্মান এবং ঘোষিত ডিকলোনাইজেশন দর্শনের সঙ্গেও সরাসরি সাংঘর্ষিক।
সিএ/জেএইচ


