চীন, রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার অংশগ্রহণে সপ্তাহব্যাপী যৌথ নৌ মহড়া শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মহড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার কূটনৈতিক সম্পর্কে উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে মার্কিন বাহিনীর একের পর এক তেলের ট্যাঙ্কার জব্দের ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই নৌ মহড়া শুরু হওয়ায় এর তাৎপর্য আরও বেড়েছে। উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় অনুষ্ঠিত এই মহড়াকে কেবল শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক উত্তেজনার বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই মহড়াকে শুধুমাত্র সামরিক অনুশীলন হিসেবে নয়, বরং উদীয়মান অর্থনীতির জোট ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যৌথ সংকল্পের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সের জয়েন্ট অপারেশন ডিভিশনের কমান্ডার ক্যাপ্টেন নন্ডওয়াখুলু থমাস থামাহা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘এটি একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকারের প্রদর্শন।’ তিনি আরও বলেন, ‘ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা সামুদ্রিক পরিবেশে এ ধরনের সহযোগিতা কোনো বিকল্প নয়, এটি অত্যাবশ্যক। আমাদের উদ্দেশ্য নৌপথ এবং সামুদ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’
ব্রিকস জোটটি শুরুতে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়ে গঠিত হলেও পরবর্তীতে এতে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সর্বশেষ ইন্দোনেশিয়া যোগ দেয়।
এই নৌ মহড়ায় চীন ও ইরান ডেস্ট্রয়ার শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে। রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পাঠিয়েছে করভেট শ্রেণির জাহাজ। স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত করেছে একটি ফ্রিগেট। পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া, ইথিওপিয়া ও ব্রাজিল পর্যবেক্ষক হিসেবে মহড়ায় অংশ নিয়েছে।
এই মহড়াগুলো মূলত গত বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে জোহানেসবার্গে আয়োজিত জি-২০ সম্মেলনের সঙ্গে সময়সূচির সংঘাতের কারণে তা স্থগিত করা হয়। ওই সম্মেলন যুক্তরাষ্ট্র বর্জন করেছিল। ওয়াশিংটন দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রিকস জোটের বিরুদ্ধে ‘মার্কিনবিরোধী’ নীতির অভিযোগ তুলেছে এবং আগে থেকে আরোপিত শুল্কের পাশাপাশি সদস্য দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কসহ একাধিক নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা আগেও যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার মুখে পড়েছে। এর মধ্যে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের মিত্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত উল্লেখযোগ্য।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে আফ্রিকানারদের ওপর কথিত ‘গণহত্যা’ এবং তাদের জমি বাজেয়াপ্ত করার অভিযোগ তোলেন। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন।
এদিকে প্রেসিডেন্ট রামাফোসার নেতৃত্বাধীন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সঙ্গে জাতীয় ঐক্য সরকারের অংশীদার ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স এই নৌ মহড়ার সমালোচনা করেছে। দলটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই মহড়াগুলোকে ‘ব্রিকস সহযোগিতা’ বলা আসলে একটি রাজনৈতিক কৌশল, যার মাধ্যমে আসল সত্য আড়াল করা হচ্ছে। বাস্তবে সরকার রাশিয়া ও ইরানের মতো বিতর্কিত ও নিষেধাজ্ঞাভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক বেছে নিচ্ছে।’
এর আগেও ২০২৩ সালে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে নৌ মহড়া আয়োজন করায় দক্ষিণ আফ্রিকা সমালোচনার মুখে পড়ে। সে সময় ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রথম বার্ষিকীর সঙ্গে ওই মহড়া মিলে যাওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি করে। উল্লেখ্য, চীন, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথমবারের মতো যৌথ নৌ মহড়া চালায় ২০১৯ সালে।
সিএ/এসএ


