ব্যায়াম মানেই ওজন কমবে—এই ধারণা আমাদের অনেকের মধ্যেই গভীরভাবে গেঁথে আছে। জিমে ট্রেডমিলে দৌড়ে ঘাম ঝরানো, ক্যালরি বার্নের সংখ্যা দেখে স্বস্তি পাওয়া—সব মিলিয়ে মনে হয়, ওজন কমা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক সময়ই ভিন্ন। নিয়মিত ব্যায়াম করেও অনেকের ওজন কমে না, বরং একই জায়গায় আটকে থাকে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ওজন কমানোর ক্ষেত্রে ব্যায়ামের ভূমিকা আমরা যতটা ভাবি, বাস্তবে তা ততটা সরাসরি কার্যকর নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক ইউনিভার্সিটির গবেষক হারমান পন্টজার ও এরিক ট্রেক্সলারের গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যায়ামের মাধ্যমে বাড়তি ক্যালরি পোড়ালে শরীর নিজেই অন্য খাত থেকে শক্তি খরচ কমিয়ে দেয়।
গবেষণায় ১৪টি ভিন্ন গবেষণা ও প্রায় ৪৫০ জন মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কেউ যদি ব্যায়াম করে ২০০ ক্যালরি খরচ করেন, তবে মোট শক্তি ব্যয় বাস্তবে বাড়ে মাত্র ৬০ ক্যালরি। বাকি ক্যালরি শরীর অন্য প্রক্রিয়ায় সাশ্রয় করে নেয়। অর্থাৎ শরীর এক ধরনের কম্পেনসেশন মোডে চলে যায়।
পন্টজারের ভাষায়, শরীর অত্যন্ত হিসেবি। ব্যায়ামে শক্তি বেশি খরচ হলে শরীর বিপাকক্রিয়া ধীর করে দেয়, এমনকি ঘুমের সময়ও ক্যালরি খরচ কমিয়ে ফেলে। ফলে জিমে যত ক্যালরি পোড়ানো হয়, তার বড় অংশই শরীর অন্যভাবে পুষিয়ে নেয়।
তানজানিয়ার হাদজা উপজাতির মানুষদের ওপর গবেষণায়ও এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। সারাদিন শিকার ও শারীরিক পরিশ্রমে ব্যস্ত থাকলেও আধুনিক শহুরে মানুষের তুলনায় তাদের মোট শক্তি ব্যয়ের পার্থক্য খুব বেশি নয়। বিবর্তনের ধারায় মানবদেহ এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যাতে শক্তি সঞ্চয় করাই হয় মূল লক্ষ্য।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দৌড়ঝাঁপের তুলনায় ওয়েট লিফটিং বা ভারোত্তোলনে ক্যালরি খরচ কিছুটা বেশি হয়। কারণ পেশি মেরামতের জন্য বাড়তি শক্তি লাগে। তবে এখানেও চর্বি কমার হার খুব বেশি নয়। ফলে ওজন কমানোর ক্ষেত্রে একে জাদুকরী সমাধান বলা যায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন কমানোর মূল চাবিকাঠি হলো ক্যালরি ডেফিসিট। অর্থাৎ দৈনিক যে পরিমাণ ক্যালরি পোড়ানো হয়, তার চেয়ে কম ক্যালরি গ্রহণ করা। এক বেলা ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলা অনেক সময় দৌড়ে ৫০০ ক্যালরি পোড়ানোর চেয়েও কার্যকর হতে পারে।
তবে ব্যায়াম পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় নয়। ওজন ধরে রাখতে, হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধে ব্যায়ামের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু শুধু ব্যায়াম করলেই ওজন কমবে—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে।
সিএ/এমআর


