অনেক সময় মানুষ নিজেকে স্বার্থপর বলে মনে করেন। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মানুষের স্বভাবগত প্রবণতা আসলে অন্যকে সাহায্য করার দিকেই বেশি ঝুঁকে থাকে। ছোট শিশুরাও পুরস্কারের প্রত্যাশা ছাড়াই অন্যের উপকার করতে এগিয়ে আসে। গবেষকদের মতে, সহমর্মিতা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য।
ক্যামব্রিজ অ্যালায়েন্স অব লিগ্যাল সাইকোলজির পরিচালক চিং-ইউ হুয়াং জানান, শিশুরা খুব অল্প বয়স থেকেই অন্যের কল্যাণকে গুরুত্ব দিতে শেখে। তারা বুঝে ওঠার আগেই সহানুভূতির আচরণ প্রকাশ করে, যা প্রমাণ করে মানুষের মধ্যে সাহায্য করার মানসিকতা স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যমান।
শুধু শিশুরাই নয়, প্রাপ্তবয়স্করাও সংকটময় পরিস্থিতিতে সাহসিকতার পরিচয় দেন। ২০১৭ সালে ম্যানচেস্টারের একটি কনসার্টে আত্মঘাতী হামলার সময় বহু মানুষ নিজের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে অন্যদের নিরাপদে বের করে আনেন। একইভাবে ২০১৫ সালের প্যারিস হামলার সময়ও অনেক মানুষ অন্যদের রক্ষায় এগিয়ে আসেন। লিডস বেকেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র মনোবিজ্ঞানী স্টিভ টেলর বলেন, বিপদের মুহূর্তে মানুষ অনেক সময় স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদার আচরণ করে এবং নিজের নিরাপত্তার কথা ভুলে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে যায়।
দৈনন্দিন জীবনেও পরোপকারিতার নানা উদাহরণ দেখা যায়। রাস্তায় পড়ে থাকা জিনিস ফেরত দেওয়া, অসুস্থ মানুষকে সহযোগিতা করা কিংবা প্রতিবেশীর সমস্যায় পাশে দাঁড়ানো—এসব ছোট কাজ মানুষের সহমর্মিতারই প্রতিফলন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কাজ মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ মানসিক চাপ কমায়, আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং একাকীত্ব দূর করতে সহায়তা করে।
মানুষের মস্তিষ্কের গঠনও অন্যকে সাহায্য করার প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী অ্যাবিগেল মার্শ জানান, যারা অপরিচিত মানুষকে অঙ্গদান করেছেন, তাদের মস্তিষ্কের ডান পাশের অ্যামিগডালা তুলনামূলকভাবে বড় এবং তারা অন্যের অনুভূতি দ্রুত বুঝতে পারেন। এটি মানুষের দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নির্দেশ করে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সব সময় নিঃস্বার্থ হওয়া সম্ভব নয়। কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক টনি মিলিগান বলেন, অতিরিক্ত উদার মানুষের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করলে হতাশা তৈরি হতে পারে। তাই নিজের সামর্থ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সাহায্যের হাত বাড়ানো উচিত।
এছাড়া সংস্কৃতিও মানুষের আচরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পশ্চিমা সমাজে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বেশি গুরুত্ব পায়, আর এশিয়ার দেশগুলোতে সামাজিক দায়িত্ববোধ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। করোনাভাইরাস মহামারির সময় দেখা গেছে, যারা সামাজিক দায়িত্বকে গুরুত্ব দেন, তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং অন্যকে সহায়তা করার ক্ষেত্রেও বেশি সচেতন ছিলেন।
সব মিলিয়ে গবেষণা বলছে, মানুষ স্বভাবগতভাবেই সহমর্মী। অন্যকে সাহায্য করা যেমন সমাজের জন্য ভালো, তেমনি নিজের সুস্থতা ও ভারসাম্য রক্ষা করাও জরুরি।
সিএ/এমআর


