জার খোলার সময় ঢাকনায় চাপ দেওয়া, বাজারের ব্যাগ বহন করা, দরজা ঠেলা কিংবা হোঁচট খেলে নিজেকে সামলে নেওয়ার মতো সাধারণ কাজগুলোতে প্রতিদিনই আমরা হাতের শক্তির ওপর নির্ভর করি। কিন্তু এই হাতের মুঠোর শক্তি, যাকে গ্রিপ স্ট্রেংথ বলা হয়, শুধু দৈনন্দিন কাজেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এটি মানুষের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য, শারীরিক সক্ষমতা এমনকি আয়ুর সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে, একজন মানুষ কতটা জোরে হাত মুঠো করতে পারেন, তার সঙ্গে সামগ্রিক স্বাস্থ্য, বয়সজনিত পরিবর্তন এবং মৃত্যুঝুঁকির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ক্যানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটির কাইনেসিওলজিস্ট পিট রোহলেডারের মতে, গ্রিপ স্ট্রেংথ দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অনেক সময় অবহেলিত সূচক। মাত্র কয়েক সেকেন্ড হাত চেপে ধরার মাধ্যমেই বোঝা যায় একজন মানুষ কীভাবে চলাফেরা করেন, কী ধরনের খাবার খান, কতটা বিশ্রাম নেন এবং সামগ্রিকভাবে তাঁর জীবনযাপন কেমন।
গ্রিপ স্ট্রেংথ পরিমাপের জন্য একটি বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, যেখানে নির্দিষ্ট সময় ধরে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে ধরতে হয়। এই পরীক্ষাটি শুধু হাতের পেশির শক্তি নয়, বরং স্নায়ুতন্ত্র, জয়েন্ট, টেন্ডন, হৃদ্যন্ত্র এবং শরীরের বিপাক ব্যবস্থার অবস্থাও ইঙ্গিত করে। এ কারণে অনেক বিশেষজ্ঞ এই পরীক্ষাকে দ্রুত ও কার্যকর স্বাস্থ্য মূল্যায়নের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায়, শক্তিশালী গ্রিপ স্ট্রেংথ মানে হলো উন্নত পেশিশক্তি, কার্যকর স্নায়ুতন্ত্র, পর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহ ও অক্সিজেন সরবরাহ এবং ভালো ইনসুলিন সংবেদনশীলতা। এই কারণেই অনেক গবেষক গ্রিপ স্ট্রেংথকে রক্তচাপ বা বিএমআইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফাংশনাল ভাইটাল সাইন হিসেবে বিবেচনা করছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য দেয়।
দীর্ঘায়ুর সঙ্গেও গ্রিপ স্ট্রেংথের সম্পর্ক স্পষ্টভাবে পাওয়া গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন বড় গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের গ্রিপ স্ট্রেংথ কম, তাদের হৃদ্রোগ, ক্যানসারসহ নানা কারণে মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। ১৭টি দেশের প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ভবিষ্যৎ মৃত্যুঝুঁকি নির্ণয়ে গ্রিপ স্ট্রেংথ সিস্টোলিক রক্তচাপের চেয়েও কার্যকর সূচক হতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দুর্বল গ্রিপ স্ট্রেংথ শরীরের ভেতরের জৈবিক বয়স বেশি হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ডিএনএভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের গ্রিপ শক্তিশালী, অনেক সময় তাদের জৈবিক বয়স প্রকৃত বয়সের তুলনায় কম থাকে। অর্থাৎ হাতের শক্তি ভালো থাকলে শরীরের কোষ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গও তুলনামূলকভাবে সুস্থ থাকে।
হাতের শক্তি ভালো হলে বড় কোনো অসুখ বা অস্ত্রোপচারের পর দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও বাড়ে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ আরদেশির হাশমির মতে, গ্রিপ স্ট্রেংথ দেখে বোঝা যায় অসুস্থতার সময় শরীর কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দুর্বল গ্রিপ স্ট্রেংথ থাকলে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, হাঁটার গতি কমে, সিঁড়ি ভাঙা ও দৈনন্দিন কাজে সমস্যা দেখা দেয়। এমনকি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে; যাদের গ্রিপ শক্তিশালী, তাদের মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের হার তুলনামূলকভাবে কম এবং মস্তিষ্কের গঠনও বেশি সুস্থ থাকে।
সব মিলিয়ে হাতের মুঠোর শক্তি কেবল শারীরিক সক্ষমতার মাপকাঠি নয়, বরং এটি শরীরের ভেতরের সামগ্রিক সুস্থতার একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিফলন। আজ আপনি কতটা জোরে হাত চেপে ধরতে পারেন, সেটিই ভবিষ্যতে আপনার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে।
সিএ/এমআর


