মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা ট্যাব ব্যবহার করে দিনের বড় একটা সময় আমরা কানে হেডফোন বা ইয়ারফোন গুঁজে রাখি। গান শোনা, সিনেমা দেখা, অনলাইন মিটিং কিংবা গেমিং—সব জায়গায় হেডফোন ব্যক্তিগত জগতের দরজা খুলে দেয়। ভিড়ের মাঝেও নিজের মতো থাকা যায়, শব্দের দখল নেওয়া যায়। কিন্তু এই আরামের নীরব সঙ্গী ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তির বড় শত্রু হয়ে দাঁড়াতে পারে, যদি যথেষ্ট সচেতনতা না থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৮৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দে দীর্ঘ সময় ধরে হেডফোন ব্যবহার করলে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তবুও অনেকে ভলিউম আরও বেশি রেখে গান বা ভিডিও দেখেন, বিশেষ করে বাস, রিকশা বা ভিড়ের মধ্যে। কানের ভেতরের সূক্ষ্ম কোষ একবার নষ্ট হলে তা আর ফিরে আসে না। কানে শোঁ শোঁ শব্দ, হালকা ব্যথা বা ভারী ভাব শুরু হলে তা ভবিষ্যতের বড় সমস্যার ইঙ্গিত।
অনেকেই কাজের ফাঁকে, হাঁটার সময় বা ঘুমের মাঝেও হেডফোন ব্যবহার করেন। এতে কানের বিশ্রামের সুযোগ পায় না। দীর্ঘক্ষণ চাপ থাকলে শুধু শ্রবণশক্তি নয়, কানের ভেতরের ত্বকেও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে ইন-ইয়ার ইয়ারফোনে ঘাম ও ধুলোমিশ্রিত হয়ে ব্যাকটেরিয়া তৈরি হতে পারে, যা থেকে কানে চুলকানি, ব্যথা বা ইনফেকশনও সৃষ্টি হতে পারে।
শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। অনলাইন ক্লাস, গেমিং এবং ভিডিও কনটেন্টের কারণে তাদের হেডফোন ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণে। কিন্তু সংবেদনশীল কানের কারণে ক্ষতির সম্ভাবনাও বেশি। অনেক সময় তারা বুঝতেই পারে না সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তাই অভিভাবকদের উচিত ভলিউম নিয়ন্ত্রণ করা এবং নির্দিষ্ট সময়ের বেশি হেডফোন ব্যবহার না করতে দেওয়া।
রাস্তায় চলাচলের সময় হেডফোন কানে থাকলে আশপাশের শব্দ শোনা যায় না। গাড়ির হর্ন, সিগন্যাল বা অন্যান্য সতর্ক সংকেত শুনতে না পেলে তা মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় এটি একটি সাধারণ কিন্তু অনেক সময় প্রাণঘাতী ভুল হিসেবেই দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা ‘৬০–৬০ নিয়ম’ মানার পরামর্শ দেন। অর্থাৎ ভলিউম ৬০ শতাংশের বেশি না রাখা এবং টানা ৬০ মিনিটের বেশি সময় হেডফোন ব্যবহার না করা। মাঝেমধ্যে হেডফোন খুলে কানে বিশ্রাম দেওয়া জরুরি। নিয়মিত ইয়ারফোন পরিষ্কার রাখা, ঘুমের সময় ব্যবহার না করা এবং প্রয়োজনে নয়েজ ক্যানসেলিং হেডফোন ব্যবহার করাও ভালো বিকল্প, যাতে কম ভলিউমেই পরিষ্কার শব্দ পাওয়া যায়।
হেডফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে, তবে সচেতন ব্যবহারেই শ্রবণশক্তির মতো মূল্যবান সম্পদকে রক্ষা করা সম্ভব। কারণ শব্দ থামানো যায়, কিন্তু একবার নষ্ট হওয়া শ্রবণশক্তি আর ফেরানো যায় না।
সিএ/এমআর


