Tuesday, February 24, 2026
26.5 C
Dhaka

বাহাদুর শাহ জাফরঃ মোঘল চলচিত্রের শেষ নায়ক

“উমর দরাজ মাঙ্গঁকে লায়েথে চার দিন
দো আরজুমে কাট গয়ে, দো ইন্তেজার মেঁ।”

বাংলায় অনুবাদ করলে অর্থ আসে “চার দিনের জন্য আয়ু নিয়ে এসেছিলাম। দু’টি কাটল প্রত্যাশায় আর দু’টি অপেক্ষায়।”
এই চরণ দুটি বাহাদুর শাহ জাফরের। শেষ মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের কথাই বলছি। দিল্লির লাল কেল্লায় ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, সাম্রাজ্য হারিয়ে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় কবিতা লিখেই সময় কাটাতেন তিনি।

পিতার মৃত্যুর পর বাহাদুর শাহ ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন বাহাদুর শাহ। সিংহাসন তখন নামমাত্র চলছিলো। বাহাদুর শাহ এর পিতামহ এবং পিতা উভয়ই ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পেনশনভোগী।

তিনি নিজেও বার্ষিক এক লক্ষ টাকা ভাতা পেতেন। পিতার মতো বাহাদুর শাহ নিজের ও মুঘল খান্দানের ভরণপোষণে ভাতা বৃদ্ধির জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন।
বৃটিশ সরকার রাজি হয়েছিলো শর্ত দিয়ে। শর্ত ছিলো “বাদশাহ” উপাধি ত্যাগ করতে হবে আর লালকেল্লার বাইরে সাধারণ নাগরিকের মতো জীবনযাপন করতে হবে। এই শর্তে রাজি হননি বাহাদুর শাহ।

সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনয়ন নিয়ে ইংরেজদের সঙ্গে সম্রাটের মনোমালিন্য হয়। সম্রাটের ক্ষমতা ও মর্যাদা নষ্ট করতে তৎপর হয় কোম্পানি। এ সময় বেদনা ভুলে থাকার জন্য সম্রাট গজল ও মুশায়েরায় নিমগ্ন থাকতেন ; লালকেল্লায় সাহিত্যের আসর বসিয়ে সময় কাটাতেন।
কেল্লায় অভ্যন্তরে ভালোই কাটছিলো দিন। সিংহাসনে বসার বিশ বছর পর্যন্ত সব চলছিলো একই রকম। হঠাৎই চিত্র পাল্টে গেলো ভারত বর্ষের। বিদ্রোহীর দানা বাঁধলো ব্যারাকে। সিপাহি বিদ্রোহের কথা বলছি। যারা ইতিহাস নিয়ে কখনই খোঁজ খবর রাখেন না তাদের কানেও নিশ্চয় এসেছে এই বিদ্রোহের কথা। সিপাহি বিদ্রোহ যখন শুরু হয় ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের দমদম সেনাছাউনিতে।

আর ১১ই মে সিপাহিরা দিল্লি অধিকার করে এবং সেদিন তাঁরা লাল কেল্লায় প্রবেশ করে।
নামেমাত্র মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে ভারতের স্বাধীন সম্রাট বলে ঘোষণা করে সিপাহিরা। সম্রাটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে শপথ নেয় তারা। এ দিন গভীর রাতে লালকেল্লায় একুশবার তোপধ্বনির মাধ্যমে সম্রাটকে দেওয়ান-ই খানোস এ সম্মান জানানো হয়। সম্রাটের বয়স তখন ৮২ বছর।
সম্রাট নিজে এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভারতবর্ষে। বিদ্রোহ লাভ করে নতুন রূপ।
একের পর সেনাছাউনিতে বিদ্রোহ হতে থাকে।

‘খালক-ই খুদা, মুলক ই বাদশাহ, হুকুম ই সিপাহি’ স্লোগানে চলতে থাকে বিদ্রোহ। তবে ইংরেজরা অতি নির্মমভাবে এই বিদ্রোহ দমন করে। হাজার হাজার স্বাধীনতাকামীর রক্তে রঞ্জিত হয় ভারতবর্ষের মাটি। ইংরেজরা দিল্লি দখল করে নেয় এবং সম্রাট ২১ সেপ্টেম্বর আত্মসমর্পণ করেন। ইংরেজ সৈন্যরা মীর্জা মোগল, মীর্জা খিজির সুলতান, মীর্জা আবু বকরসহ ২৯ জন মুঘল শাহজাদাসহ বহু আমির ওমরাহ, সেনাপতি ও সৈন্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সম্রাটকে বিচারের নামে প্রহসনের আদালতে দাঁড় করানো হয়। হাজির করা হয় বানোয়াট সাক্ষী। বিচারকরা রায় দেন, দিল্লির সাবেক সম্রাট ১০ মে থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংগঠনের দায়ে অপরাধী। তার শাস্তি চরম অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। কিন্তু তার বার্ধক্যের কথা বিবেচনা করে প্রাণ দণ্ডাদেশ না নিয়ে নির্বাসনে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়।

রেঙ্গুনে পাঠানো হয় সম্রাটকে। ব্রিটিশ বাহিনীর ক্যাপ্টেন নেলসন ডেভিসের বাসভবনের ছোট গ্যারেজে সম্রাট ও তার পরিবার-পরিজনের বন্দিজীবন শুরু হয়। সম্রাটকে শুতে দেয়া হয় একটা পাটের দড়ির খাটিয়ায়। রেঙ্গুনেই ইতি ঘটে মোঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাটের। স্বদেশের ভূমিতে জায়গা হলো সম্রাটের। এই দুঃখে তিনি লিখেছিলেন, মরনেকে বাদ ইশক্ব মেরা বা আসর হুয়া উড়নে লাগি হ্যায় খাক মেরি ক্যোয়ি ইয়ার মে; কিৎনা বদনসিব জাফর দাফনকে লিয়ে দোগজ জামিন ভি মিলানা চুকি ক্যোয়ি ইয়ার মে’

ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী মায়ানমার সফরে গিয়ে তার সমাধি সৌধ পরিদর্শন করেন।সে সময় তিনি পরিদর্শক বইতে লিখেছিলেন –
“দু গজ জমিন তো না মিলি হিন্দুস্তান মে , পার তেরী কোরবানী সে উঠি আজাদী কি আওয়াজ, বদনসীব তো নাহি জাফর, জুড়া হ্যায় তেরা নাম ভারত শান আউর শওকত মে, আজাদী কি পয়গাম সে”।

১৭৭৫ সালের ২৪ শে অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন এই সম্রাট। চ্যানেল আগামীর পক্ষ থেকে সম্রাটকে স্মরণ করছি শ্রদ্ধার সাথে।

spot_img

আরও পড়ুন

ইনহেলার ব্যবহারে রোজা ভাঙবে কি না

রমজান মাসে সুস্থ মস্তিষ্ক ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের ওপর রোজা...

ইফতারে স্বাস্থ্যকর শরবতের সহজ রেসিপি

দীর্ঘ সময় রোজা রাখার পর শরীরের অন্যতম প্রধান চাহিদা...

শহর-বিধ্বংসী গ্রহাণু শনাক্তে বড় চ্যালেঞ্জ বিজ্ঞানীদের

পৃথিবীর দিকে বিপুল সংখ্যক শহর-বিধ্বংসী গ্রহাণু ধেয়ে আসার আশঙ্কায়...

সাহরির সুরে জেগে ওঠে মুসলমানিত্ব

পবিত্র মাহে রমজান ধর্মীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর...

রমজানে মাথাব্যথা কেন বাড়ে

রমজানে সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারের সময় স্বস্তি এলেও...

মার্চের শুরুতে বড় চমক আনতে পারে অ্যাপল

মার্চের শুরুতেই একাধিক নতুন পণ্য উন্মোচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রযুক্তি...

তাবলিগের মুরুব্বিদের ইবাদতের জীবন

রমজান মাস এলেই তাবলিগ জামাতের প্রাচীন বুজুর্গদের জীবনে দেখা...

ইফতারে চিয়া সিড খাওয়ার উপকারিতা

রমজান মাসে চিয়া সিড খাওয়ার সঠিক সময় নিয়ে অনেকের...

সবার মন জয় করে নেয়া ৭ মাস বয়সি নিঃসঙ্গ বানর ‘পাঞ্চ’

টোকিওর কাছাকাছি অবস্থিত ইচিকাওয়া সিটি চিড়িয়াখানায় ‘পাঞ্চ’ নামে সাত...

ভিডিও এআই প্রযুক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন হলিউড

চীনা একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ভিডিও তৈরির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে...

অটোরিকশা থেকে ছিটকে সড়কে, ট্রাকের নিচে পিষ্ট হয়ে মৃত্যু শিক্ষার্থীর

কক্সবাজারের চকরিয়ায় একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা (ইজিবাইক) থেকে ছিটকে পড়ে...

ঢাকাসহ ৫ বিভাগে দু–এক স্থানে সামান্য বৃষ্টির সম্ভাবনা

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া একটি লঘুচাপ দুর্বল...

চট্টগ্রামের হালিশহরে বিস্ফোরণে মৃতের সংখ্যা বেড়ে তিন, তদন্ত কমিটি গঠন

নগরের হালিশহরের হালিমা মঞ্জিল নামের ছয়তলা ভবনে ঘটে যাওয়া...

রাজনৈতিক হয়রানিমূলক আরও ১২০২টি মামলা প্রত্যাহারের অনুমোদন দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিরোধী...
spot_img

আরও পড়ুন

ইনহেলার ব্যবহারে রোজা ভাঙবে কি না

রমজান মাসে সুস্থ মস্তিষ্ক ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের ওপর রোজা ফরজ। এই মাসের একটি রোজার গুরুত্ব পূর্ণ বছরের নফল রোজার চেয়েও বেশি বলে ধর্মীয় ব্যাখ্যায়...

ইফতারে স্বাস্থ্যকর শরবতের সহজ রেসিপি

দীর্ঘ সময় রোজা রাখার পর শরীরের অন্যতম প্রধান চাহিদা হয়ে ওঠে পানি ও সতেজতা। সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থাকার কারণে শরীরে পানিশূন্যতা ও ক্লান্তি...

শহর-বিধ্বংসী গ্রহাণু শনাক্তে বড় চ্যালেঞ্জ বিজ্ঞানীদের

পৃথিবীর দিকে বিপুল সংখ্যক শহর-বিধ্বংসী গ্রহাণু ধেয়ে আসার আশঙ্কায় বিজ্ঞানী মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নাসার ভারপ্রাপ্ত প্ল্যানেটারি ডিফেন্স অফিসার কেলি ফাস্ট জানিয়েছেন,...

সাহরির সুরে জেগে ওঠে মুসলমানিত্ব

পবিত্র মাহে রমজান ধর্মীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর আবহ বাঙালিয়ানার সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে সাহরির সময় ভেসে আসা ডাক, মসজিদের...
spot_img