রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) আর্থিকভাবে গভীর সংকটে পড়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ আইনের আওতায় নেওয়া বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর কারণে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত দেউলিয়া হওয়ার মুখে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে পিডিবির লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। গত দেড় দশকে বিদ্যুতের দাম তিন গুণেরও বেশি বাড়ানো হলেও লোকসানের চক্র থেকে বের হতে পারেনি সংস্থাটি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে করা বিশেষ আইনের সুযোগ নিয়ে প্রতিযোগিতা ছাড়াই বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এসব কেন্দ্র থেকে পারস্পরিক যোগসাজশে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা এবং উৎপাদন না হলেও কেন্দ্রভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে গিয়ে পিডিবির আর্থিক চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আইনি সুরক্ষার আড়ালে বিদ্যুৎ খাতে নেওয়া একের পর এক দুর্নীতিনির্ভর প্রকল্পের বোঝা এখন পিডিবিকে টেনে নামাচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালে বিদ্যুৎ, জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের আওতায় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে সরাসরি দর-কষাকষির মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব চুক্তিতে বিদ্যুৎ ক্রয়ের মূল্য স্বাভাবিক দামের তুলনায় অনেক বেশি নির্ধারণ করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেই বিদ্যুৎ কিনে নেয় পিডিবি। বর্তমানে দেশে মোট ১৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬৮টিই বেসরকারি। এসব কেন্দ্রের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিডিবিকে কেন্দ্রভাড়া বাবদ দিতে হয়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেশি। একই সঙ্গে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ৫৯ হাজার কোটি টাকা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে ওই বিশেষ আইনটি বাতিল করে। পাশাপাশি আইনটির আওতায় করা চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। প্রায় দেড় বছর পর্যালোচনা শেষে কমিটি বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ত্রুটি, ক্রয় চুক্তিতে দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের প্রমাণ পায়। ২৫ জানুয়ারি কমিটি তাদের প্রতিবেদন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের কাছে হস্তান্তর করে।
হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের এই কমিটিতে ছিলেন বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক সিওও আলী আশরাফ, বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন এবং ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান।
কমিটির প্রধান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিশেষ আইনের আওতায় করা চুক্তিগুলোতে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও চাতুর্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব চুক্তি জাতীয় স্বার্থ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্টের পরিপন্থী ছিল। দুর্নীতির কারণে বিদ্যুৎ খাতের টিকে থাকা নিয়েই গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ সালে খুচরা বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট ২ টাকা ৫০ পয়সা। দেড় দশকে সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সায়, যা ১৮১ শতাংশ বৃদ্ধি। তবে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে পিডিবিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ গড়ে ১২ টাকা ৩৫ পয়সা দরে কিনতে হচ্ছে, আর বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে গড়ে ৬ টাকা ৬৩ পয়সায়। এই ব্যবধানের কারণে শুধু টিকে থাকতে হলে বিদ্যুতের দাম আরও ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে পিডিবির লোকসান ছিল ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন চার গুণ বাড়লেও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দেওয়া অর্থ বেড়েছে ১১ গুণের বেশি। একই সময়ে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ।
জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশেষ আইনের আওতায় অনুমোদিত তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে স্বাভাবিক দামের তুলনায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বেশি দরে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন বলেন, এই আইনের অধীনে করা চুক্তিগুলো সরাসরি পিডিবিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র বারবার উপেক্ষিত হওয়ায় পিডিবির লোকসান অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশ নিয়ে মতামত জানতে পিডিবির বর্তমান চেয়ারম্যান রেজা উল করিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিএ/এসএ


