আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১১ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থী ও দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, এই আসনের অন্যতম প্রধান সমস্যা রাজনৈতিক এবং উন্নয়ন না হওয়ার মূল কারণও রাজনৈতিক। তিনি বলেন, ‘আর সেই রাজনৈতিক কারণ হচ্ছে ভূমিদস্যুতা। আগস্টের (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট) আগে যারা প্রধান দুই দল হিসেবে পরিচিত ছিল, তাদের এখানকার স্থানীয় নেতারাই ৩০ বছর ধরে ভাগ–বাঁটোয়ারা করে ভূমি দখল করেছেন। নির্বাচিত হলে ঢাকা-১১ আসনে ভূমিদস্যুদের সিন্ডিকেট চিরতরে নির্মূল করা হবে।’
রোববার (৭ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার মেরুল বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্ট খেলার মাঠে এনসিপি–মনোনীত এবং ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য–সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। জনসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক।
নাহিদ ইসলাম বলেন, এই এলাকার শত শত মানুষের জমি, শত শত খাসজমি ও সাধারণ জলাশয় দখল করে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। এতে শত শত পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘যাঁরা রাজনীতির ময়দানে ছিলেন, তাঁরাই ভূমিদস্যু হিসেবে এসব কাজ করেছেন অথবা ভূমিদস্যুদের সহায়তা করেছেন।’ গত ৩০ বছরের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি মূলত ভূমি দখল, নদী দখল ও ভাগ–বাঁটোয়ারার ইতিহাস। আগস্টের আগে যারা প্রধান দুই দল হিসেবে পরিচিত ছিল, তাদের এখানকার স্থানীয় নেতারাই দীর্ঘদিন ধরে এই দখলদারির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘৫ আগস্টের পরে একজন চলে এসেছেন। আর এখানে যিনি দখলদারি ও চাঁদাবাজি করতেন, তিনি তাঁর স্থানে চলে গেছেন। এই এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে তাঁরা জনগণের বিরুদ্ধে সব সময় কাজ করে গেছেন।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণের সামনে ভূমিদস্যু, দখলদার, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও ঋণখেলাপিদের পরাজিত করার সুযোগ এসেছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, নির্বাচিত হলে এই এলাকার অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা হবে এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি উপস্থিত জনতার প্রতি শুভেচ্ছা ও সালাম জানান। নাহিদ ইসলাম বলেন, তিনি এই এলাকার সন্তান এবং কোনো জাতীয় বক্তব্য দিতে আসেননি; বরং এলাকার মানুষের কথা বলতেই মঞ্চে এসেছেন। তিনি জানান, তাঁর জন্ম ঢাকার বেরাইদে এবং বাড্ডা–রামপুরায় তাঁর শৈশব কেটেছে। ঢাকার এত কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও বাড্ডা–ভাটারা এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে।
তিনি বলেন, ভেতরের দিকে গেলে অনেক সময় মনে হয় এটি ঢাকা নয়, যেন মফস্সলের কোনো এলাকা। এখানকার মানুষ নানা অসুবিধার মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করছে। তবে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় বাড্ডা–রামপুরা আন্দোলন–প্রতিরোধের অন্যতম ‘হটস্পট’ হয়ে উঠেছিল।
ঢাকা-১১ আসনের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সুযোগ এলে এই এলাকার মানুষ প্রতিরোধ করেছে। বহু মানুষ জীবন দিয়েছে, আহত হয়েছে। তিনি ১৯৭১ সালের ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা বাড্ডা, বেরাইদ ও আশপাশ এলাকায় অবস্থান করতেন এবং নৌকা দিয়ে এসে অপারেশন চালিয়ে ফিরে যেতেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় তিনি কয়েক দিন এই আসনের বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপনে ছিলেন এবং ঢাকা-১১ তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে। তিনি বলেন, তাঁর জীবনের ২৮ বছরও এই এলাকা তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে এবং এখন তিনি ঢাকা-১১ আসনের মানুষের প্রতি সেই ঋণ শোধ করতে চান।
ঢাকা-১১ আসনে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের বসবাস উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, যদিও ভোটার সংখ্যা ৪ দশমিক ৫ লাখ, এত ঘনবসতি থাকা সত্ত্বেও এখানে পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা নেই। পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই, স্কুল নেই, হাসপাতালও নেই।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ভাটারা–বাড্ডার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ইনফরমাল ইকোনমির সঙ্গে যুক্ত, অর্থাৎ ক্ষুদ্র ব্যবসা ও দিনমজুর শ্রেণির। এই এলাকায় শিক্ষিত বেকারের হার ৮ থেকে ১০ শতাংশ। তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য খাত প্রায় শতভাগ প্রাইভেট সেক্টরের ওপর নির্ভরশীল, কারণ এখানে কোনো সরকারি হাসপাতাল নেই। পুরো ঢাকা-১১ আসনে একটি সরকারি হাইস্কুলও নেই এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে মাত্র ১৫টি।
বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই এলাকার প্রায় ৬০ শতাংশ তলিয়ে যায় উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বাড্ডার মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ এলাকা পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। বাকি অংশ অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ও নর্দমার ওপর নির্ভরশীল। রামপুরা খাল, শাহজাদপুর খাল ও বালু নদ দখল করে ভরাট করায় এসব জলাধার আর পানি নিষ্কাশনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
সারা দেশে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে নাহিদ ইসলাম বলেন, শুধু ঢাকা-১১ নয়, সমগ্র বাংলাদেশেই এই জোটের প্রার্থীরা জয়ী হবে। তিনি বলেন, ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীদের ভোট দিয়ে জয়ী করতে হবে।
বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে আরেকটি দল রয়েছে যারা দেশকে বিপদগ্রস্ত করার পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে দখলদারমুক্ত, আধিপত্যবাদমুক্ত ও সন্ত্রাসমুক্ত করতে হবে।’
সিএ/এমই


