সবুজ চা বাগান, টিলা-পাহাড়, জলপ্রপাত, হাওর ও বৈচিত্র্যময় নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন জেলা মৌলভীবাজার। জেলার সাতটি উপজেলাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য দর্শনীয় স্থান প্রতিবছর দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ করে। ঈদের ছুটিসহ বিভিন্ন অবকাশে পরিবার নিয়ে ভ্রমণের জন্য অনেকের কাছেই পছন্দের গন্তব্য এই জেলা।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এ বনকে প্রাকৃতিক গবেষণাগার হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। প্রায় এক হাজার ২৫০ হেক্টর আয়তনের এ বনভূমিতে রয়েছে শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী। ১৯২৫ সালে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে এ বনের যাত্রা শুরু হলেও ১৯৯৬ সালের ৭ জুলাই এটিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের আবাসস্থল হিসেবেও লাউয়াছড়ার বিশেষ পরিচিতি রয়েছে।
কমলগঞ্জের আরেকটি জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান মাধবপুর লেক। চারপাশে সবুজ চা বাগান আর পাহাড়ি টিলায় ঘেরা লেকটির স্বচ্ছ জলরাশি পর্যটকদের মুগ্ধ করে। শাপলায় ভরা লেকের নৈসর্গিক সৌন্দর্য প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে।
একই উপজেলায় রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান স্মৃতি কমপ্লেক্স। মহান মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতার স্বীকৃতি পাওয়া এই বীর সেনানীর স্মৃতিকে ঘিরে নির্মিত কমপ্লেক্সটি দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
বড়লেখা উপজেলার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত দেশের সবচেয়ে বড় জলপ্রপাত হিসেবে পরিচিত। প্রায় ২০০ ফুট উঁচু পাহাড়ি টিলা থেকে নেমে আসা পানির ধারা প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। জলপ্রপাতের আশপাশে খাসিয়া নৃগোষ্ঠীর বসতি থাকায় ভ্রমণে যুক্ত হয় ভিন্ন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।
শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরের অন্তর্গত বাইক্কা বিল শীত মৌসুমে অতিথি পাখির নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়। নানা প্রজাতির পাখির কলকাকলি আর প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতে প্রতিদিন সেখানে ভিড় করেন পর্যটকরা।
শ্রীমঙ্গলের প্রবেশমুখে স্থাপিত ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্য বহন করছে এ অঞ্চলের চা শিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বধ্যভূমি পার্কও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য আকর্ষণীয় একটি স্থান হলো ডিনস্টন সিমেট্রি। ফিনলে টি কোম্পানির ডিনস্টন চা-বাগানের ভেতরে অবস্থিত এই কবরস্থানে শতবর্ষ পুরোনো ৪৬টি বিদেশি কবর সংরক্ষিত রয়েছে।
এ ছাড়া মৌলভীবাজারে রয়েছে হামহাম জলপ্রপাত, মণিপুরী পল্লী, হাকালুকি হাওর, মনু ব্যারেজ, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, কমলা রানীর দীঘি, পৃথিমপাশা নবাববাড়ি, পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্ট, খাসিয়া পুঞ্জি, বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক, পদ্মছড়া লেক, ক্যামেলিয়া লেক, পাত্রখোলা লেক, বাম্বোতল লেক ও শমশেরনগর গলফ মাঠসহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থান।
পর্যটকদের আবাসনের জন্য জেলায় গড়ে উঠেছে বিভিন্ন মানের হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ। এর মধ্যে রয়েছে গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ, দুসাই রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, নভেম ইকো রিসোর্ট, লেমন গার্ডেন রিসোর্ট, গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্ট অ্যান্ড ট্যুর, সুইস ভ্যালি রিসোর্ট, বালিশিরা ইকো রিসোর্ট, টিলাগাঁও ইকো ভিলেজ, নিসর্গ ইকো রিসোর্ট ও টি হেভেন রিসোর্ট।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাবেক সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমেদ বলেন, ‘হামের প্রভাব ও ঈদের পর স্বল্প ছুটির কারণে এবার রিসোর্টগুলোতে আগাম বুকিং তুলনামূলক কম।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল জোনের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী জানান, ‘ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নোবেল চাকমা বলেন, ‘জেলার গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পুলিশ মোতায়েন করা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে।’
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সড়কপথে সহজেই মৌলভীবাজারে যাওয়া যায়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনযোগে শ্রীমঙ্গল, ভানুগাছ, শমশেরনগর কিংবা কুলাউড়া রেলস্টেশনে নেমে স্থানীয় পরিবহনে করে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানো সম্ভব।
সিএ/এমই


