সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা এলাকা জমে ওঠে নানা মুখরোচক খাবারের গন্ধে। বগুড়া জিলা স্কুলের সামনে ফুটপাতে সারি সারি ছোট দোকানে সাজানো থাকে কাবাব, চাপ, লুচিসহ নানা পদের খাবার। কয়লার আগুনে পোড়া মাংসের ধোঁয়া আর মসলার গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এই ফুটপাত হয়ে ওঠে খাবারপ্রেমীদের আড্ডার অন্যতম জায়গা।
এই এলাকার সবচেয়ে পুরোনো কাবাব বিক্রেতাদের একজন আজিজার রহমান গেদা (৭২)। ১৯৮৮ সাল থেকে তিনি সাতমাথার ফুটপাতে গরুর ভুঁড়ির কাবাব বিক্রি করে আসছেন। ছোট পরিসরে শুরু করা এই ব্যবসা দিয়েই তিনি সংসার গড়েছেন, বাড়ি করেছেন, জমি কিনেছেন এবং সন্তানদের পড়ালেখার খরচ জুগিয়েছেন। বর্তমানে তাঁর এক নাতি একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করছেন এবং আরেক নাতি সরকারি আজিজুল হক কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনা করছে।
বিকেল থেকেই দোকানগুলোতে ক্রেতাদের আনাগোনা শুরু হয়, তবে সন্ধ্যার পর ভিড় বাড়তে থাকে। শুধু বগুড়া শহর নয়, আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকেও অনেক মানুষ এখানে আসেন গরুর ভুঁড়ির কাবাব ও লুচি খেতে। বগুড়া শহরের বউবাজার এলাকার বাসিন্দা আহসান হাবিব বলেন, ‘গেদার গরুর ভুঁড়ির মজাদার চাপ ছাড়া সাতমাথায় আড্ডা জমে না। ৩৬ বছর ধরে সাতমাথায় কয়লার আগুনে পোড়া ভুঁড়ির কাবাব-লুচি বিক্রি করছেন তিনি। প্রতিদিন সাতমাথায় এসে বন্ধুদের নিয়ে তাঁর দোকানে ভুঁড়ির মজাদার কাবাব, লুচি আর পাশের দোকানে চা খেয়ে আড্ডায় মেতে উঠি।’
সোমবার মধ্যরাতেও সাতমাথা এলাকায় মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কয়লার আগুনে কাবাব আর লুচি তৈরির ফাঁকে আজিজার রহমান নিজের জীবনের গল্প শোনান। তাঁর জন্ম গাবতলী উপজেলার রানীরপাড়া গ্রামে। বাবা আজগর আলী ছিলেন প্রান্তিক কৃষক। সংসারের অভাব দূর করতে বড় ভাই মেহের আলী পাকিস্তান আমলে বগুড়া শহরে এসে একটি হোটেলে কাজ শুরু করেন। তাঁর হাত ধরেই ১৯৬৫ সালে কিশোর বয়সে গ্রাম থেকে শহরে এসে গুলশান হোটেলে কাজ নেন আজিজার রহমান। সে সময় সপ্তাহ শেষে তাঁর বেতন ছিল মাত্র দুই টাকা।
১৯৭১ সালে তিনি বিয়ে করেন। পরে ১৯৭৫ সালে হোটেল বয়ের চাকরির বেতন জমিয়ে শহরের কইগাড়ি এলাকায় তিন শতক জমিতে একটি বাড়ি তৈরি করেন এবং সেখানেই স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। হোটেলে কাজ শেষে রাতে তিনি প্রায়ই সাতমাথার মাধু হলে সিনেমা দেখতে যেতেন। হলের সামনে ফুটপাতে মোস্তাক বিহারি নামে এক ব্যক্তি কয়লার আগুনে গরুর মাংসের কাবাব ও লুচি বিক্রি করতেন। নিয়মিত তাঁর দোকানে খেতে খেতে একসময় দুজনের মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠে। মোস্তাক বিহারির কাছ থেকেই গরুর ভুঁড়িতে মসলা মাখিয়ে লোহার শিকে গেঁথে কয়লার আগুনে পুড়িয়ে কাবাব বানানোর কৌশল শেখেন আজিজার রহমান। পরে ১৯৮৮ সালে হোটেলের চাকরি ছেড়ে নিজেই এই ব্যবসা শুরু করেন।
তিনি জানান, শুরুতে মাত্র ৩৫ টাকা পুঁজি দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। সে সময় একটি গরুর ভুঁড়ির দাম ছিল ১৫ টাকা। তেল-মসলা কিনতে লাগে ১০ টাকা এবং বাকি টাকায় লোহার শিক ও কয়লার চুলাসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা হয়। প্রথম দিনেই তিনি প্রায় ৩০০ টাকার কাবাব ও লুচি বিক্রি করেছিলেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
বর্তমানে তাঁর দোকানে গরুর ভুঁড়ির কাবাব ও লুচি বিক্রি হয়। তাঁর দেখাদেখি সাতমাথা এলাকায় আরও ৬ থেকে ৭ জন বিক্রেতা বিকেল থেকে কাবাবের দোকান বসান। প্রতি শিক কাবাব ৫ টাকা এবং লুচি ৫ টাকায় বিক্রি করা হয়। আগে বেচাবিক্রি বেশি হলেও এখন তুলনামূলক কম। তাই একটি ভুঁড়ি কিনে চার দিন ধরে সংরক্ষণ করে কাবাব তৈরি করেন তিনি। প্রতিদিন খরচ বাদে তাঁর প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা লাভ থাকে।
আজিজার রহমান জানান, এই ব্যবসার আয়ে ছেলে আলমগীর হোসেন স্নাতক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন এবং বর্তমানে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করছেন। একমাত্র মেয়ে মল্লিকা রহমানও স্নাতক পাস করে বিবাহিত জীবন শুরু করেছেন। ছেলে, ছেলের স্ত্রী ও দুই নাতিকে নিয়ে তাঁর পরিবার। স্ত্রী নূর জাহান বেগম প্রায় দেড় বছর আগে মারা গেছেন।
আজিজারের দোকানের পাশেই কাবাব বিক্রি করেন আবদুল মজিদ (৫০)। তিনি শহরের মালগ্রাম এলাকার বাসিন্দা। তাঁর ভাই আফসার আলী ষাটের দশক থেকেই সাতমাথা এলাকায় শিক কাবাব বিক্রি করতেন। আশির দশকে গাবতলী উপজেলার সোনাপুর গ্রাম থেকে শহরে এসে বড় ভাইকে দোকানে সহযোগিতা করতেন আবদুল মজিদ। পরে নব্বইয়ের দশকে নিজেই আলাদাভাবে কাবাবের ব্যবসা শুরু করেন।
আবদুল মজিদ বলেন, ‘সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দোকান খুলে বসি। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ কেজি গরুর মাংসের শিক কাবাব বিক্রি হয়। প্রতি শিক কাবারের দাম ১৫ টাকা। লুচির দাম ৫ টাকা। ব্যবসার আয়ে তিন ছেলেমেয়েকে পড়ালেখা করিয়েছেন। এর মধ্যে এক মেয়ে স্নাতকে পড়ছে। আরেক মেয়ে উদ্যোক্তা।’
কথা বলার মাঝেই পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে কাবাব খেতে আসেন তানভীর আলম। তিনি একসঙ্গে ১৪টি শিক কাবাব ও আটটি লুচির অর্ডার দেন। মজিদ মসলায় মাখানো মাংসের কিমা শিকে গেঁথে কয়লার আগুনে পুড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তানভীর বলেন, ‘লুচির সঙ্গে মজাদার শিক কাবাব খেতে দারুণ স্বাদ। ফুটপাতে হলেও এখানকার কাবাবে মাখানো মসলায় জাদু আছে। চারটা শিক খেতে বসে ৮-১০টা খাওয়া যায়। দামেও সস্তা।’
সিএ/এমই


