জীবিকার সন্ধানে মানুষ চাকরি, ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়। ইসলাম শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের নীতিমালাই নয়, বরং চাকরিজীবী, করপোরেট কর্মী, নিয়োগকর্তা এবং ফ্রিল্যান্সার—সবার জন্যই ন্যায়, সততা ও দায়িত্বশীলতার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ইসলামি শিক্ষায় কর্মক্ষেত্রে সততা, আমানতদারি ও পারস্পরিক অধিকার রক্ষা কেবল পেশাগত দায়িত্ব নয়, বরং তা ইবাদতের অংশ হিসেবেও বিবেচিত।
কর্মজীবনে হালাল উপার্জন নিশ্চিত করতে ইসলাম পাঁচটি মৌলিক নীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
প্রথমত, চুক্তি ও শর্ত যথাযথভাবে পালন করা। কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগদানের সময় নির্ধারিত দায়িত্ব, সময় ও শর্ত মেনে চলা প্রত্যেক কর্মীর ধর্মীয় দায়িত্ব। নির্ধারিত সময়ের বিনিময়ে বেতন গ্রহণ করেও দায়িত্বে অবহেলা করা বা সময় নষ্ট করা আমানতের খিয়ানতের শামিল। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারগুলো পূর্ণ করো।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ১)
দ্বিতীয়ত, কর্মীর পারিশ্রমিক সময়মতো পরিশোধ করা। ইসলাম নিয়োগকর্তাকে কর্মীর ন্যায্য প্রাপ্য দ্রুত পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে। শ্রমের মূল্য আটকে রাখা বা বিলম্ব করা অন্যায় ও জুলুম হিসেবে বিবেচিত। এ বিষয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিয়ে দাও তার গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৪৪৩)
তৃতীয়ত, কর্মক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, ঘুষ ও দুর্নীতি পরিহার করা। অযোগ্য ব্যক্তিকে প্রভাব খাটিয়ে দায়িত্ব দেওয়া কিংবা ঘুষের মাধ্যমে পদ বা সুবিধা অর্জন ইসলামি দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়ের ওপর আল্লাহর লানত বা অভিশাপ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩১৩)
চতুর্থত, কর্মঘণ্টাকে আমানত হিসেবে দেখা। অফিসের সময় ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় করা, দায়িত্বে অবহেলা করা কিংবা অসত্য অজুহাতে ছুটি নেওয়া হালাল উপার্জনের পরিপন্থী। এ বিষয়ে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে (কিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৯৩)
পঞ্চমত, কর্মীদের সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব না দেওয়া। ইসলাম নিয়োগকর্তাকে অধীনস্থদের প্রতি মানবিক আচরণের নির্দেশ দিয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তারা তোমাদেরই ভাই, আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্থ করেছেন… সুতরাং তাদের এমন কাজের কষ্ট দিয়ো না, যা তাদের সাধ্যের অতীত, আর যদি এমন কঠিন কাজ দাও, তবে তোমরা নিজেরাও তাদের সাহায্য করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০)
কর্মজীবন নিয়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উঠে এসেছে। দায়িত্ব পালনের কারণে পাওয়া অতিরিক্ত উপহার বা বকশিশকে অনেক ক্ষেত্রে সুপ্ত ঘুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। একইভাবে সুদের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কাজ করার বিষয়েও ইসলামি আইনজ্ঞরা কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন।
অন্যদিকে বর্তমান সময়ের ফ্রিল্যান্সিং বা রিমোট জবের ক্ষেত্রেও কাজের ধরনই মূল বিবেচ্য। যদি কোনো কাজ মদ, জুয়া, সুদ বা অন্য কোনো হারাম কার্যক্রমের প্রচার-প্রসারে সহায়তা না করে এবং চুক্তিতে প্রতারণা না থাকে, তাহলে সেই উপার্জন শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ বলে বিবেচিত হতে পারে।
সিএ/এমআর


