ইসলামের ইতিহাসে কুফা শুধু একটি শহরের নাম নয়, বরং এটি ছিল সামরিক, প্রশাসনিক ও স্থাপত্যিক পরিকল্পনার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পারস্য বিজয়ের পর মুসলিম শাসনের বিস্তারে ইরাকের এই শহর দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসে।
দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)–এর নির্দেশনায় এবং সাহাবি সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)–এর তত্ত্বাবধানে ১৭ হিজরির মুহাররম মাসে কুফা শহরের ভিত্তি স্থাপন করা হয়।
কাদেসিয়া ও মাদায়েন বিজয়ের পর মুসলিম সেনাদের জন্য উপযোগী আবাসন গড়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দেয়। সে সময় মাদায়েনের আবহাওয়া আরব অঞ্চলের মুসলিম যোদ্ধাদের জন্য অনুকূল ছিল না। তাই খলিফা ওমর এমন একটি অঞ্চল খুঁজতে বলেন, যা মরু আবহাওয়ার কাছাকাছি এবং কাঁকরময়।
সালমান ফারসি ও হোজায়ফা (রা.)–এর পরামর্শে হিরা ও ফোরাত নদীর মধ্যবর্তী একটি কাঁকরময় অঞ্চল নির্বাচন করা হয়। আরবি ভাষায় কাঁকরময় ভূমিকে ‘কুফা’ বলা হয় বলেই শহরটির এ নামকরণ হয়েছে।
শহর পরিকল্পনার শুরুতেই কেন্দ্রস্থলে জামে মসজিদের স্থান নির্ধারণ করা হয়। মসজিদের পাশে নির্মাণ করা হয় বায়তুলমাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার এবং প্রশাসনিক ভবন। এতে ধর্মীয় ও প্রশাসনিক কার্যক্রম একই কেন্দ্র থেকে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়।
কুফার নগর পরিকল্পনা সে সময়ের তুলনায় অত্যন্ত আধুনিক ছিল। প্রধান সড়কগুলো রাখা হয়েছিল ৪০ হাত চওড়া। ছোট সড়কের প্রস্থ ছিল ৩০ হাত এবং গলিপথ কমপক্ষে ৭ হাত প্রশস্ত রাখা হয়। প্রশস্ত এসব সড়ক শহরের বাতাস চলাচল ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখত।
খলিফা ওমর (রা.) বাড়িঘর নির্মাণের ক্ষেত্রেও কিছু নীতিমালা নির্ধারণ করেছিলেন। অগ্নিকাণ্ড এড়াতে ইটের ঘর নির্মাণের অনুমতি থাকলেও বাড়ি যেন অতিরিক্ত উঁচু বা তিন কক্ষের বেশি না হয়, সে নির্দেশনাও ছিল।
কুফার জামে মসজিদ শহরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, রুজবা ফারিসি নামের এক দক্ষ স্থপতি এই নির্মাণকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
শহরটিতে শুরুতে মুসলিম মুজাহিদ ও সাধারণ জনগণ বসবাস করলেও পরে পারস্যের একটি সেনাদল জিজিয়ার বিনিময়ে সেখানে থাকার অনুমতি পায়। এদের ‘হামরায়ে দায়লাম’ বলা হতো।
এ ছাড়া নাজরানের ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোকদের জন্য আলাদা আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠে, যা ‘নাজরানিয়া’ মহল্লা নামে পরিচিত ছিল। ফলে কুফা ধীরে ধীরে একটি বহুসাংস্কৃতিক নগরীতে পরিণত হয়।
৩৬ হিজরিতে ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলি ইবনে আবু তালিব (রা.) রাজধানী মদিনা থেকে কুফায় স্থানান্তর করেন। সামরিক কৌশল, ভৌগোলিক সুবিধা এবং ইরাকের অর্থনৈতিক গুরুত্ব এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় কারণ ছিল।
পরবর্তী পাঁচ বছর কুফা ইসলামি খেলাফতের কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হয়। তবে ৪০ হিজরিতে খলিফা আলি (রা.)–এর শাহাদতের পর রাজধানী সিরিয়ার দামেশকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ঐতিহাসিকদের মতে, কুফার স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনা খলিফা ওমর (রা.)–এর দূরদর্শী চিন্তার প্রতিফলন। শহরটিতে একদিকে ছিল নগরজীবনের সুবিধা, অন্যদিকে খোলা পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য।
সিএ/এমআর


