বাংলাদেশে মহাকাশবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণাকে এগিয়ে নিতে একটি জাতীয় মানমন্দির প্রতিষ্ঠার দাবি ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আধুনিক বিশ্বে যখন মহাকাশ গবেষণায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আবিষ্কার হচ্ছে, তখন বাংলাদেশ এখনো কার্যকর কোনো গবেষণাধর্মী মানমন্দির গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে দেশের শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছেন।
প্রাচীনকাল থেকেই রাতের আকাশ, নক্ষত্র আর গ্রহ নিয়ে মানুষের আগ্রহ ছিল প্রবল। সমুদ্রযাত্রায় দিকনির্ণয় থেকে শুরু করে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের বহু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে এই কৌতূহল। বর্তমানে সৌরজগতের বাইরের গ্রহ, মহাকর্ষ তরঙ্গ কিংবা দূরবর্তী গ্যালাক্সি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গবেষণা চলছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা সীমাবদ্ধ রয়েছে ছোট পরিসরের টেলিস্কোপ ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মধ্যে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবেশী ভারত ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মানের মানমন্দির নির্মাণ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে বিজ্ঞানীদের হাতে এখনো পর্যাপ্ত প্রযুক্তি ও অবকাঠামো পৌঁছেনি। সম্প্রতি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু হওয়ায় তরুণদের মধ্যে এ বিষয়ে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এখন হাতে-কলমে গবেষণার সুযোগ চান। তাই এক মিটার ব্যাসের আয়নাযুক্ত গবেষণা-মানের টেলিস্কোপসহ একটি জাতীয় মানমন্দির স্থাপনকে সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহের ইতিহাসও বেশ পুরোনো। যশোরের রাধাগোবিন্দ চন্দ্র নিজের বাড়িতে বসেই বিষম তারা নিয়ে গবেষণা করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। গাজীপুরে জন্ম নেওয়া বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার তাপীয় আয়নন তত্ত্ব আজও বিশ্বজুড়ে পড়ানো হয়। পরবর্তীকালে দেশের বিভিন্ন বিজ্ঞান সংগঠনও টেলিস্কোপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য আকাশ দেখার আয়োজন করে তরুণদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
তবে এখনো দেশে এমন কোনো পূর্ণাঙ্গ মানমন্দির নেই, যেখানে শিক্ষার্থীরা সরাসরি উন্নত গবেষণা করতে পারবেন। আইইউবিতে ‘সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি, স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস’ প্রতিষ্ঠিত হলেও গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় বড় অবকাঠামো এখনো অনুপস্থিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি জাতীয় মানমন্দির প্রতিষ্ঠা হলে তা শুধু গবেষণাই নয়, বিজ্ঞান শিক্ষাকেও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
গবেষকদের মতে, শুরুতে এক মিটার ব্যাসের একটি টেলিস্কোপ দিয়েই কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব। এই ধরনের টেলিস্কোপকে পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানে অত্যন্ত কার্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আধুনিক ডিজিটাল সেন্সর সংযুক্ত থাকলে দূরবর্তী গ্যালাক্সি, গ্রহাণু, সুপারনোভা কিংবা নক্ষত্রের আলোর সূক্ষ্ম পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, শুধু টেলিস্কোপ স্থাপন করলেই হবে না, এর সঙ্গে প্রয়োজন আধুনিক ক্যামেরা, স্পেকট্রোগ্রাফ এবং তথ্য বিশ্লেষণ প্রযুক্তি। স্পেকট্রোগ্রাফের মাধ্যমে নক্ষত্রের উপাদান, তাপমাত্রা ও গতিবেগ নির্ণয় করা সম্ভব হবে। এতে মহাবিশ্বের গঠন ও সম্প্রসারণ নিয়ে গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
মানমন্দির স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচনও বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন গবেষকেরা। বাংলাদেশের আর্দ্র আবহাওয়া ও শহরাঞ্চলের আলোকদূষণের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট কিংবা উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকাকে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট এবং বিজ্ঞানীদের আবাসনের সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, একটি জাতীয় মানমন্দির শুধু গবেষণাগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি দেশের তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গণিত শিক্ষায় অনুপ্রাণিত করবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং ও তথ্য বিশ্লেষণের মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার পথে এগোতে চাইলে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, জ্ঞান ও গবেষণাতেও অবদান রাখতে হবে বলে মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, একটি জাতীয় মানমন্দির দেশের বিজ্ঞানচর্চাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে সক্ষম হবে।
সিএ/এমআর


