ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার হরিপুর দেউলী গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর এক নিদর্শন—ভূঁইয়া বাড়ি জামে মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে সুপরিচিত এই মসজিদটি কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে বহু বছর ধরে। তবে এর নির্মাণকাল বা নির্মাতার সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো অজানা রয়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ১৮টি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদটির গায়ে সময়ের ছাপ স্পষ্ট। বাইরের দেয়ালে শেওলা জমেছে, চারপাশে গাছগাছালিতে ঘেরা পরিবেশ। মসজিদের সামনে রয়েছে বড় একটি পুকুর এবং পাশে একটি কবরস্থান। মসজিদের সিঁড়ির অনেকাংশই এখন বিলীন, পাশের ‘বিবির ঘর’ নামে পরিচিত একটি পুরোনো স্থাপনাও মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
মসজিদটির স্থাপত্যে রয়েছে দুটি বড় গম্বুজ। এছাড়া প্রতিটি স্তম্ভের ওপর ছোট গম্বুজ থাকায় অনেকে একে বিশ গম্বুজের মসজিদ হিসেবেও উল্লেখ করেন। স্তম্ভ ও গম্বুজজুড়ে সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং নকশার ছাপ দেখা যায়, যা প্রাচীন স্থাপত্যকলার নিদর্শন বহন করে। মসজিদে দুটি দরজা ও দুটি জানালা রয়েছে এবং ভেতরের দেয়ালজুড়ে রয়েছে নান্দনিক অলংকরণ।
মসজিদের খতিব মাওলানা মো. বাদী বিল্লাহ বলেন, ‘জেলার প্রাচীন ঐতিহ্য এই মসজিদ। এই মসজিদ কে নির্মাণ করেছেন, কত সালে নির্মিত হয়েছে, তা কেউ বলতে পারেন না, কোনো নথিপত্রও নেই। শুধু মসজিদের ভেতরে খোদাই করা একটি সংস্কার সাল আছে। মসজিদের সঠিক ইতিহাস আমাদের জানা নেই। তবে দেয়াল ও ইটের ধরন অনুযায়ী এটি মোগল স্থাপত্য বা সুলতানি আমলের প্রথম দিকের হতে পারে বলে আমাদের ধারণা।’ তিনি জানান, মসজিদের ভেতরে ইমামসহ প্রায় ৪০ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। পরবর্তীতে স্থান সংকুলানের কারণে বারান্দার কিছু অংশ বাড়ানো হয়েছিল।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকায় ময়মনসিংহের সংরক্ষিত পুরাকীর্তিগুলোর মধ্যে এই মসজিদটি অন্যতম। ২০১৯ সালের ১৯ আগস্ট এটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের গেজেটের মাধ্যমে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। গেজেটের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশবিরোধী ফকির বিদ্রোহের সময় এই মসজিদটি নির্মিত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
তবে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত হলেও মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণ যথাযথভাবে হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোনো সাইনবোর্ড নেই এবং সংস্কারের অভাবে বেশ কিছু অংশ ভগ্নপ্রায় হয়ে পড়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান জানান, বর্তমানে চলমান প্রকল্পে এটি অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও আগামী অর্থবছরে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। সাইনবোর্ড না থাকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা মসজিদটির সংরক্ষণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। মো. মুকিদুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, প্রাচীন এই কারুকাজ যেন হারিয়ে না যায়, সে জন্য প্রয়োজন যথাযথ সংরক্ষণ। অন্যদিকে আতিকুজ্জামান খান বলেন, ছোটবেলা থেকেই মসজিদটিকে একই অবস্থায় দেখে আসছেন, তবে এটি যে অত্যন্ত প্রাচীন—সে বিষয়ে সবারই ধারণা রয়েছে।
সিএ/এমই


