মহাকাশের গভীর থেকে আসা অদ্ভুত সংকেতের উৎস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে আসছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে আসা তিনটি রহস্যময় সংকেতের শক্তির উৎস শনাক্ত করার দাবি করেছেন একদল গবেষক। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এক্সাইটেড ডার্ক ম্যাটার নামের বিশেষ ধরনের পদার্থের কারণে এসব অস্বাভাবিক সংকেত তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বের অন্যতম রহস্যময় উপাদান। ধারণা করা হয়, এটি পুরো মহাবিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অংশ জুড়ে রয়েছে। তবে সাধারণ পদার্থের সঙ্গে সরাসরি প্রতিক্রিয়া না দেখানোর কারণে শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়েও এটিকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয় না। তবুও বিজ্ঞানীদের ধারণা, ডার্ক ম্যাটার পরোক্ষভাবে গ্যালাক্সির নানা অস্বাভাবিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।
কিংস কলেজ লন্ডনের বিজ্ঞানী শ্যাম বালাজি বলেন, ‘আমরা যখন নক্ষত্রের বিস্ফোরণের মতো পরিচিত জ্যোতির্বিজ্ঞানের ঘটনা দেখি, তখন সেগুলো মিল্কিওয়ে থেকে আসা নির্দিষ্ট শক্তি ও আকৃতির এই সংকেতগুলোর পূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে পারে না। এখন আমরা দেখিয়েছি, কীভাবে একটি উত্তেজিত ডার্ক ম্যাটার মডেল অন্তত দুটি বা সম্ভবত তিনটি ব্যাখ্যাহীন সংকেতের কারণ হতে পারে।’
বিজ্ঞানীদের মতে, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্র অত্যন্ত অস্থির ও জটিল পরিবেশের একটি অঞ্চল। সেখানে শক্তিশালী মহাকর্ষ বল ঘন গ্যাসের মেঘকে সংকুচিত করে দ্রুতগতির নক্ষত্র তৈরি করে। এ অঞ্চলের মাঝখানেই রয়েছে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল স্যাজিটেরিয়াস এ স্টার, যার ভর সূর্যের তুলনায় প্রায় ৪০ লাখ গুণ বেশি। এই শক্তিশালী অভিকর্ষ ও তাপ থেকে বিভিন্ন ধরনের বিকিরণ নির্গত হয়, যা মহাকাশে থাকা টেলিস্কোপ দিয়ে শনাক্ত করা যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই অঞ্চলে গামা রশ্মি বিকিরণের একটি তীব্র স্পাইক পাওয়া গেছে, যা খুব নির্দিষ্ট একটি তরঙ্গদৈর্ঘ্যে অবস্থান করে। এর বৈশিষ্ট্য সাধারণ পদার্থের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ডার্ক ম্যাটার কণাগুলোর পারস্পরিক সংঘর্ষের ফলে সাময়িকভাবে উচ্চ শক্তির অবস্থায় পৌঁছে যাওয়ার ঘটনাই এর কারণ হতে পারে।
বিজ্ঞানী বালাজি বলেন, উত্তেজিত ডার্ক ম্যাটার কণাগুলো যখন সংঘর্ষের পর আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, তখন তারা অতিরিক্ত শক্তি নির্গত করে। এ প্রক্রিয়ায় একটি ইলেকট্রন ও তার অ্যান্টিম্যাটার সঙ্গী পজিট্রন তৈরি হয়। এসব পজিট্রন মহাকাশে এমন ধরনের সংকেত তৈরি করে, যা ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির ইন্টিগ্রাল মিশনের মতো গভীর মহাকাশ পর্যবেক্ষণকারী টেলিস্কোপ দিয়ে শনাক্ত করা সম্ভব।
বিজ্ঞানীরা ইন্টিগ্রাল মিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, উত্তেজিত ডার্ক ম্যাটার থেকে উৎপন্ন পজিট্রনের সংঘর্ষই গামা রশ্মির ওই রহস্যময় সংকেতের সম্ভাব্য উৎস হতে পারে। তাদের ধারণা, এই মডেলটি গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে আসা আরও কিছু অস্বাভাবিক আলোর ব্যাখ্যাও দিতে পারে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গ্যালাক্সির কেন্দ্রের কাছাকাছি সেন্ট্রাল মলিকুলার জোন নামে একটি অঞ্চলে অস্বাভাবিক মাত্রার আয়নীকরণ দেখা যায়। পৃথিবী থেকে প্রায় ২৮ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই এলাকায় গ্যালাক্সির প্রায় ৮০ শতাংশ ঘন গ্যাস রয়েছে। এতদিন কসমিক রশ্মি দিয়ে এই আয়নীকরণের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। নতুন ডার্ক ম্যাটার মডেল এই রহস্যেরও সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
সিএ/এমআর


