বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ক্রমেই মানুষের দৈনন্দিন কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কোডিং, ডিজাইন, বিপণন, হিসাবরক্ষণসহ নানা পেশাগত ক্ষেত্রে দ্রুততা ও দক্ষতা বাড়াতে এআই ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। তবে গবেষকরা সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের মানসিক সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায় এই প্রবণতাকে ‘এআই ব্রেইন ফায়ার’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে একাধিক এআই টুল নিয়মিত ব্যবহার ও পর্যবেক্ষণের ফলে অনেক কর্মীর মধ্যে মানসিক ক্লান্তি ও মনোযোগহীনতা বাড়ছে।
গবেষণার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ১ হাজার ৪৮৮ জন কর্মীর ওপর একটি সমীক্ষা চালানো হয়। এতে দেখা যায়, যারা নিয়মিত বিভিন্ন এআই সিস্টেম ব্যবহার করেন বা সেগুলোর কার্যক্রম তদারকি করেন, তাদের একটি বড় অংশ অতিরিক্ত মানসিক চাপ অনুভব করছেন। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় ১৪ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, সারাক্ষণ এআই ব্যবস্থাপনার কারণে তাদের মধ্যে মস্তিষ্কে ঝিমঝিম ভাব, মনোযোগের ঘাটতি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধীরগতি এবং মাথাব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
গবেষকদের মতে, সাধারণ কর্মক্ষেত্রের চাপ বা বার্নআউটের সময় মানুষ আবেগগতভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে বা কাজে আগ্রহ হারায়। কিন্তু ‘এআই ব্রেইন ফায়ার’ মূলত সরাসরি মস্তিষ্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। একাধিক এআই টুল পরিচালনা এবং সেগুলোর ফলাফল যাচাই করার প্রক্রিয়া মানসিক শক্তি দ্রুত নিঃশেষ করে দেয়।
এ অবস্থার কারণে কর্মক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, অতিরিক্ত এআই ব্যবস্থাপনার চাপ থাকলে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা প্রায় ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
পেশাভেদে এআই ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাবের মাত্রাও ভিন্ন। গবেষণার তথ্যে দেখা যায়, মার্কেটিং খাতে এ সমস্যায় সবচেয়ে বেশি কর্মী আক্রান্ত, যার হার প্রায় ২৬ শতাংশ। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও অপারেশনস বিভাগেও একই ধরনের চাপের প্রভাব লক্ষ করা গেছে। অন্যদিকে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট খাতে এআই ব্যবহারের পরিমাণ বেশি হলেও সমস্যার তালিকায় এটি চতুর্থ স্থানে রয়েছে।
অনেক কর্মীর মতে, এখন মূল কাজের চেয়ে এআই টুলগুলো পরিচালনা ও যাচাই করতেই বেশি শক্তি ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশেষ করে যারা সারাদিন এআই আউটপুট পরীক্ষা করেন, তাদের মধ্যে মানসিক ক্লান্তির মাত্রা বেশি দেখা যাচ্ছে। এর ফলে কিছু কর্মী চাকরি ছাড়ার কথাও ভাবছেন এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
তবে গবেষকরা বলছেন, এআই নিজে ক্ষতিকর নয়। বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে এটি একঘেয়ে ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ কমাতে, মানসিক চাপ হ্রাস করতে এবং সৃজনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। মূল সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন এ প্রযুক্তির ওপর অতি নির্ভরতা গড়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিকল্পিত দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে এআই কার্যকর হলেও অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সিএ/এমআর


