দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে আতঙ্কের কেনাকাটা বেড়ে গেছে। এতে অকটেন, পেট্রল ও ডিজেলের দৈনিক চাহিদা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেল সরবরাহ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, দেশে গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) মোট ৪ লাখ ১৫ হাজার টন অকটেন বিক্রি হয়েছে। সে হিসাবে দৈনিক গড় চাহিদা প্রায় ১ হাজার ১০০ মেট্রিক টন। তবে ১ থেকে ৪ মার্চ পর্যন্ত আতঙ্কের কেনাকাটার কারণে দৈনিক চাহিদা ২ হাজার টনের বেশি হয়ে যায়।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, হঠাৎ করে এভাবে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল কেনার কোনো বাস্তব কারণ নেই। অতিরিক্ত সরবরাহ অব্যাহত থাকলে মজুত দ্রুত কমে যাবে এবং এতে মজুতদাররা লাভবান হতে পারে। এ কারণে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ফিলিং স্টেশনগুলোকে ২৫ শতাংশ কম জ্বালানি তেল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিপিসি জানিয়েছে, রোববার (৭ ডিসেম্বর) থেকে প্রতিদিন ৯১৩ টন করে অকটেন সরবরাহ করা হবে। শনিবার (৬ ডিসেম্বর) পর্যন্ত হিসাবে দেশে অকটেনের মজুত রয়েছে ২৩ হাজার ৫৫ টন। এই হারে সরবরাহ অব্যাহত থাকলে প্রায় ২৫ দিন পর্যন্ত অকটেন সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া দেশীয় উৎস থেকে চলতি মাসেই আরও প্রায় ২৫ হাজার টন অকটেন মজুতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি আরও ২৫ হাজার টন অকটেন আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই দুই উৎস মিলিয়ে ৫০ হাজার টন অকটেন যুক্ত হলে তা দিয়ে প্রায় ৪৪ দিন চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘মজুত আছে, কিন্তু যুদ্ধ কবে থামবে কেউ তো আমরা জানি না। আগে থেকে আমার ঘর ঠিক করতে হবে না? সঞ্চয় রাখতে হবে না? সে জন্য আমরা এই সঞ্চয়টা করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘৯ তারিখ আমাদের আরও দুটি ভেসেল আসছে, সুতরাং ঘাটতি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারপরও যেহেতু যুদ্ধ চলছে, আমাদের খুব হিসাব করে চলতে হবে।’
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবেও দেশে জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করার পর মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক বাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং দামও দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতির প্রভাবেই দেশে অনেকেই বেশি করে জ্বালানি কিনতে শুরু করেছেন।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে ব্যবহৃত অকটেনের প্রায় ৫০ শতাংশ এবং পেট্রলের শতভাগ দেশেই উৎপাদিত হয়। ফলে আপাতত পেট্রল ও অকটেন নিয়ে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই। দেশে উৎপাদিত পেট্রলের একটি অংশ আসে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড থেকে এবং বাকি অংশ আসে বেসরকারি শোধনাগারগুলো থেকে।
গত অর্থবছরে দেশে মোট ৪ লাখ ৬২ হাজার টন পেট্রল বিক্রি হয়েছে, যার পুরোটাই দেশীয় উৎপাদন থেকে এসেছে। বিপিসি জানিয়েছে, চলতি বছরেও পেট্রল আমদানির কোনো পরিকল্পনা নেই।
অন্যদিকে ডিজেলের চাহিদাও গত কয়েক দিনে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। দেশে দৈনিক গড় ডিজেল চাহিদা প্রায় ১২ হাজার টন হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা প্রায় ২৫ হাজার টনে পৌঁছেছে। বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৮৬ টন, যা দিয়ে প্রায় ১৮ দিন সরবরাহ চালানো সম্ভব।
বিপিসি জানিয়েছে, ১৩ মার্চের মধ্যে আরও পাঁচটি জাহাজে করে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার টন ডিজেল দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি শোধনাগার থেকেও এ মাসে প্রায় ৫০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ পাওয়া যাবে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, কয়েক দিন ধরে দ্বিগুণ পরিমাণে জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে। অপচয় ও পাচার রোধে ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেল নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, বরং নাগরিক সচেতনতা প্রয়োজন।
এদিকে তেলের অতিরিক্ত চাহিদার কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। অনেক জায়গায় তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় কিছু স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধও রাখতে হয়েছে। ফিলিং স্টেশন মালিকদের সংগঠন বলছে, কয়েক দিন টানা বেশি বিক্রি হওয়ায় অনেক স্টেশনের মজুত শেষ হয়ে যায়।
পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, দেশে পেট্রল ও অকটেনের প্রকৃত সংকট নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্কের কারণে মানুষ অতিরিক্ত জ্বালানি কিনতে ভিড় করছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও বর্তমান মজুত বিবেচনায় তাৎক্ষণিক সংকটের সম্ভাবনা কম। তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং আমদানি ব্যাহত হলে ভবিষ্যতে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম তামিম বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মানুষ মজুত নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বেশি তেল কিনছে। তবে সরকারকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে আতঙ্কের কোনো কারণ নেই। একই সঙ্গে পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবহারেও সংযম দেখানো প্রয়োজন।
সিএ/এমই


