ঈদুল ফিতর ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে কেনাকাটার ব্যস্ততা বাড়তে শুরু করেছে। নতুন পোশাকের পাশাপাশি ঈদে জুতা বা স্যান্ডেল কেনার প্রতিও ক্রেতাদের আলাদা আগ্রহ দেখা যায়। ফ্যাশন ও ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে জুতা বা স্যান্ডেল অনেকের কাছেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
এই সময়টিকে সামনে রেখে রংপুরের হাতে তৈরি জুতা ও স্যান্ডেলের কারখানাগুলোতে ব্যস্ততা বেড়েছে কারিগরদের। আধুনিক যন্ত্রে তৈরি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জুতার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে তৈরি হ্যান্ডমেড স্যান্ডেলেরও চাহিদা রয়েছে।
রংপুরে দীর্ঘদিন ধরে হাতে তৈরি জুতা ও স্যান্ডেলের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তপন দাস। তিন পুরুষ ধরে তার পরিবার এই পেশায় জড়িত। তিনি জানান, বিভিন্ন উৎসবের সময় হাতে তৈরি জুতা ও স্যান্ডেলের চাহিদা বাড়ে। তবে বর্তমানে এই চামড়া শিল্প নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এই শিল্পে এখনই যদি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ না নেয়, তাহলে এর ভবিষ্যৎ খুব একটা ভালো হচ্ছে না। কারণ এ হস্তশিল্পটি এখন ফ্যাক্টরি বা অটোমেটিক মেশিনের দিকে যাচ্ছে। যারা ছোট ছোট কারখানা নিয়ে কাজ করছে তারা ওই ফ্যাক্টরির সঙ্গে তাল মিলাতে পারছে না। ওদের যে বাজারের ফিনিশিং এবং মেশিনের তৈরি যে কাজগুলির বিপরীতে যারা হ্যান্ডমেড জুতা বা স্যান্ডেল তৈরি করে তারা শতভাগ দিতে পারে না। সবদিক দিয়ে যদি বিবেচনা করা যায়, বাজারে এই শিল্পের তৈরি পণ্যের চাহিদা আছে কিন্তু সেই তুলনায় উৎপাদন আর এই শিল্প সংরক্ষণের কোনো পদক্ষেপ নেই।’
বাজারে বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের জুতা থাকলেও এখনো অনেক ক্রেতা হাতে তৈরি জুতার ওপর আস্থা রাখেন। ক্রেতা রহিম উদ্দিন জানান, ‘এই জুতোগুলো খুব টেকসই ও মজবুত। একটা জিনিস লক্ষ্য করার মত, এরকম জুতা আমরা যখন বাজারে কিনতে যাই বা কোন ব্র্যান্ডের দোকানে যাই তখন অনেক দাম দিয়ে কিনতে হয় এবং জুতাটা কেমন হবে তা নিয়ে আমরা চিন্তিত থাকি। কিন্তু অপরদিকে আমি যখন হাতে তৈরি জুতা কিনছি তখন তারা আমাকে গ্যারান্টি দিয়ে দিচ্ছে এবং বাজার থেকে আমি সাশ্রয়ে কিনতে পারছি।’
হাতে তৈরি জুতা কিনতে আসা এক কলেজ শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের দেশীয় যে শিল্পটা আছে এর মাধুর্যগত, গুণগত এবং মানসম্মত এই দিক বিবেচনা করে আমরা বাইরের পণ্য না কিনে নিজের পছন্দ মতো হাতে তৈরি এই জুতা কিনতে এসেছি।’
কারিগররা জানান, কোনো আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার ছাড়াই ধৈর্য ও দক্ষতার মাধ্যমে একেক জোড়া স্যান্ডেল তৈরি করা হয়। ট্যানারি থেকে চামড়া সংগ্রহের পর প্রথমে প্যাটার্ন তৈরি করা হয়। এরপর সেই নকশা অনুযায়ী চামড়া কেটে ফিতা, ইনসোল ও অন্যান্য অংশ তৈরি করে সেলাই, আঠা লাগানো ও পালিশের মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ জোড়া স্যান্ডেল তৈরি করা হয়।
কারিগর শিমুল দাস বলেন, ‘আমরা ট্যানারি থেকে চামড়া সংগ্রহ করি। এরপর আমরা একটা প্যাটার্ন তৈরি করি। প্যাটার্ন ডিজাইন অনুসারে আমরা চামড়া কেটে প্রস্তুত করি এরপর আমাদের মাঝে কেউ ফিতা তৈরি করে, কেউ ইনসোল তৈরি করে, কেউ সেলাই বা আঠা যুক্ত করে আবার কেউকালী দেয়ার কাজ করে। এভাবেই আমরা ধৈর্যের মাধ্যমে একেক জোড়া স্যান্ডেল তৈরি করে থাকি।’
এসব দোকানে ৩০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হয় একেক জোড়া স্যান্ডেল। রংপুর জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে হাতে তৈরি স্যান্ডেলের প্রায় ১২ থেকে ১৫টি কারখানা রয়েছে।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের প্রতিযোগিতায় হাতে তৈরি স্যান্ডেলের কদর কিছুটা কমে যাচ্ছে। ফলে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেক কারিগর ধীরে ধীরে পেশা পরিবর্তনের কথাও ভাবছেন।
সিএ/এমআর


