দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বান্দরবান জেলার পাহাড়ি এলাকায় সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে দ্বিমুখী কৃষি পদ্ধতি স্থানীয় কৃষকদের স্বাবলম্বী করে তুলেছে। শত শত বছর ধরে এই নদীর তীর ঘেঁষে পাহাড়ি ও বাঙালি জুমিয়া-চাষী পরিবারগুলো বসবাস করে আসছে।
পাহাড়ে সমতল ভূমি সীমিত হওয়ায় বর্ষায় পাহাড়ের ঢালে জুমচাষ এবং শীতে নদীর বুকে জেগে ওঠা চর এলাকায় আবাদ—এই দ্বিমুখী কৃষি পদ্ধতিই চাষীদের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। বর্ষার মৌসুমে জুমচাষে উৎপাদিত হয় ধান, মিষ্টিকুমড়া, মারফা, মরিচ, ভুট্টা এবং অন্যান্য ফসল। শীতকালে নদীর চরে চাষ হয় সবজি, বাদাম, তিল ও বিভিন্ন রবিশস্য।
বান্দরবান জেলা সদর, রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি, লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলাসহ নদীর শাখা-প্রশাখা এবং ঝিরি-ছড়ার দুইপারেও চরের এসব আবাদ দেখা যায়। স্থানীয় কৃষকরা জানান, এক সময় অনাবাদি থাকা চরগুলো এখন সারি সারি বাদামের ক্ষেতে পরিণত হয়েছে। পাহাড়ি বেলে-দোঁআশ মাটি বাদাম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে বপন করা বাদাম চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে পরিপক্ক হয়।
রোয়াংছড়ি উপজেলার চাষি অং থোয়াই চিং মারমা বলেন, প্রথমে বাঙালি চাষীরা নদীর চরে আবাদ শুরু করেছিলেন। তাদের সফলতা দেখে ধীরে ধীরে পাহাড়ি জুমিয়া পরিবারগুলোও বাদাম ও সবজি চাষে যুক্ত হয়েছে। আরেক চাষি আব্দুল মজিদ জানান, সমতলের তুলনায় পাহাড়ি চরে উৎপাদিত বাদামের আকার বড়, স্বাদ ভালো এবং বাজারে চাহিদাও বেশি।
পাহাড়ি নারী জুমিয়াদেরও চাষাবাদে অংশগ্রহণ চোখে পড়ছে। তারা বীজ বপন, আগাছা পরিষ্কার ও ফসল তোলায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। এতে পারিবারিক আয়ের পাশাপাশি নারীর আর্থিক সক্ষমতাও জোরদার হচ্ছে। স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীরাও পরিবারের আয় বৃদ্ধির জন্য মাঠে কাজ করছেন।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বান্দরবান পাহাড়ে বাদাম আবাদ হয়েছিল ২,৩৩০ হেক্টর জমিতে, যা চলতি বছর বেড়ে ২,৩৪২ হেক্টরে পৌঁছেছে। সমতলের তুলনায় পাহাড়ি বাদামের আকার বড়, স্বাদ উন্নত এবং পাইকারি বাজারে ভালো দাম পাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে বিক্রির পাশাপাশি জেলার বাইরে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
পাহাড়ে চরের বাদাম চাষে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত বীজ এবং পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। উপপরিচালক আবু নাঈম মো. সাইফুদ্দীন জানান, বর্ষায় জুমচাষ এবং শীতে চরে আবাদই পাহাড়ি কৃষিকে টেকসই অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। দ্বিমুখী কৃষি পদ্ধতির ফলে বছরের প্রায় পুরো সময়ই কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, মৌসুমি বেকারত্ব কমছে এবং পারিবারিক আয় স্থিতিশীল হচ্ছে।
সিএ/এএ


