ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ক্রেমলিনের যুদ্ধ চার বছর পার হতে চলেছে। এই সময়ে রাশিয়ার অর্থনীতি স্থবিরতা ও পতনের মধ্যে ঝুলে আছে। যুদ্ধ ব্যয় এবং প্রতিরক্ষা খাতে ফেডারেল বাজেটের চাপের কারণে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা দেখা গেলেও সাধারণ মানুষ এখন তার প্রভাব টের পাচ্ছে।
বছরের শুরু থেকেই খাবারের দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় নাকাল রাশিয়ানরা। মস্কোভিত্তিক বিজ্ঞাপন বিশেষজ্ঞ আলেকজান্ডার জানান, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে তার মাসিক খাবারের বাজেট ২২ শতাংশ বেড়ে ৩৫ হাজার রুবেল থেকে ৪৩ হাজার রুবেল (৪৫০ থেকে ৫৫৫ ডলার) হয়েছে। তিনি বলেন, ডিম, মুরগির মাংস থেকে শুরু করে মৌসুমি সবজি—প্রায় সব নিত্যপণ্যের দামই বেড়েছে। এমনকি প্রতিদিন কর্মস্থলে যাওয়ার পথে খাওয়া কফির দামও ২৬ শতাংশ বেড়ে ২৩০ রুবেল থেকে ২৯০ রুবেল হয়েছে।
মূলত পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকে রাশিয়ায় মূল্যস্ফীতি বাড়ছিল। শুরুতে মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো বড় শহরগুলোতে প্রভাব তেমন চোখে পড়েনি। তবে ২০২৫ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যায়। বেতন ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় সাধারণ মানুষের পকেটে চাপ বেড়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে রাশিয়ার পরিসংখ্যান সংস্থা রোস্ট্যাট জানায়, এক মাসের মধ্যে সুপারমার্কেটের পণ্যের দাম ২.৩ শতাংশ বেড়েছে।
বছরের শুরুতেই মাংস, দুধ, লবণ, ময়দা, আলু, পাস্তা, কলা, সাবান, টুথপেস্ট, মোজা, ডিটারজেন্ট এবং অনেক ওষুধের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে প্রতি জানুয়ারিতে মস্কোর সুপারমার্কেট চেইন ‘পাইটেরোচকা’ ৫৯টি মৌলিক পণ্যের গড় দাম হিসাব করছে। ২০২৪ সালের ঝুড়ির দাম ছিল ৭ হাজার ৩৫৮ রুবেল; ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭২৪ রুবেল, অর্থাৎ ১৮.৬ শতাংশ বৃদ্ধি। ফল ও সবজির দামও প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
রাশিয়া আমদানিনির্ভর হওয়ায় রুবেলের বিনিময় হার ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত দুগ্ধজাত পণ্যের দাম দুই বছরে ৪১ শতাংশ বেড়েছে। এর পেছনে খামারের ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণের উচ্চ সুদ ও শ্রমিক সংকটকে দায়ী করা হচ্ছে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ভ্যাট ২০ শতাংশ থেকে ২২ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে অর্থ জোগাতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মস্কোর বাসিন্দারা জানান, খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের খাদ্য ও পারিবারিক বাজেটে চাপ বেড়েছে। ৬৮ বছর বয়সী নাদেজদা গরুর মাংস না কিনে সস্তা মাছ কিনছেন। আর ক্রিস্টিনা বলেছেন, এখন খাবারের ক্ষেত্রে মূলত প্রোটিনের হিসাব নিয়ে খরচ হিসাব করছেন, বাইরে খাওয়া বন্ধ করেছেন।
২০২৫ সালের গ্রীষ্মে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এলভিরা নাবিউলিনা জানান, অর্থনীতি ভারসাম্যের কাছাকাছি। তবে কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, ধীরগতির কারণে অর্থনীতি মন্দার ঝুঁকিতে রয়েছে। তেলের দাম কমার কারণে ফেডারেল বাজেট ও ঋণ গ্রহণে চাপ বেড়েছে। ফলে আরও কর বৃদ্ধি বা সরকারি ব্যয় কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর তাতিয়ানা মিখাইলোভা বলেন, স্থবিরতা ও জিডিপি কমার প্রবণতা রয়েছে; যদিও অর্থনীতি পতনের সরাসরি ইঙ্গিত নেই, তবে তেলের দাম কমলে মন্দার ঝুঁকি বাড়বে।
সিএ/এসএ


