গত বছরের শেষ দিকে ইয়েমেন থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) কার্যত সরিয়ে দিয়েছে সৌদি আরব। এখন রিয়াদ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং অর্থ ব্যয় করে দক্ষিণ ইয়েমেনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করছে। রয়টার্সের সঙ্গে ছয়জন কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পদক্ষেপটি আঞ্চলিক পরিসরে সৌদি প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সৌদি আরব ধনী উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক সরকার হিসেবে বিভক্ত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও গোত্রগুলো একত্রিত করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে বিপুল অর্থ সহায়তার মাধ্যমে ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখছে। উত্তর ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে চলমান সংঘাত আপাতত নিয়ন্ত্রিত থাকলেও রিয়াদ নিজ দেশে বাজেট সংকটে পড়েছে।
চলতি বছরে ইয়েমেনি নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য সৌদি আরব প্রায় ৩০০ কোটি ডলার বাজেট রাখছে। এর মধ্যে ১০০ কোটি ডলার দক্ষিণের যোদ্ধাদের জন্য, যাদের বেতন আগে আবুধাবি দিত। ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মুয়াম্মার এরইয়ানি বলেন, ‘সৌদি আরব আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে এবং সব বেতন পূর্ণমাত্রায় পরিশোধ করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে।’
সৌদি সহায়তার ফলে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পুনর্গঠন করা এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের আওতায় আনা সম্ভব হবে। কর্মকর্তাদের মতে, রিয়াদ দক্ষিণ ইয়েমেনের সেই এলাকায় সাফল্যের গল্প গড়ে তুলতে চায়, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, কিন্তু হুতি নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানা থেকে নির্বাসিত।
সৌদি আরব আশা করছে, হুতিদের ওপর চাপ বৃদ্ধির ফলে তারা আলোচনার টেবিলে আসবে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য সামরিক সংঘর্ষের প্রস্তুতি হিসেবে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে শক্তিশালী করতেও চায় রিয়াদ। এছাড়া দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরও প্রলোভন দেখানো হচ্ছে—হুতিদের সঙ্গে সংঘাত সমাধি হলে বহুদিনের আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ তাদের জন্য উন্মুক্ত হবে।
সৌদি আরবের এই পদক্ষেপই প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হচ্ছে। দেশটির অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রিয়াদ প্রতিবেশী দেশ থেকে নিরাপত্তি ঝুঁকি নিতে চাইছে না। ইয়েমেনের সঙ্গে সৌদি সীমান্ত প্রায় ১,৮০০ কিলোমিটার, যা স্থিতিশীল না হলে বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটন প্রভাবিত হতে পারে।
২০১৫ সালে সৌদি আরব প্রথমবার ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে। রিয়াদ এবং আবুধাবি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দেয়, হুতিদের বিরোধিতায় সুন্নি জোট তৈরি করে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যদিও সাম্প্রতিক ইসরায়েল-গাজা সংঘর্ষের কারণে হুতিরা লোহিত সাগরে হামলা চালায়।
ডিসেম্বরে আবুধাবি-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। রিয়াদ এরপর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঐ বাহিনীর বিরুদ্ধে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী এসটিসির বিরুদ্ধে হামলার সহায়তা করে। এরপর সৌদি আরব আকর্ষণমূলক পদক্ষেপ নিলে, জানুয়ারিতে এসটিসির নেতাদের রিয়াদে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাদের খরচ বহন করা হচ্ছে এবং কিছু পরিবারের সদস্যদের সৌদি আরবে আনার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
সৌদি আরব ইতিমধ্যেই দক্ষিণ ইয়েমেনের সৈন্য ও রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের বেতন প্রদান শুরু করেছে। এই বছরের জন্য ইয়েমেনে বেতন, উন্নয়ন প্রকল্প এবং জ্বালানি সহায়তার জন্য মোট ৪০০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় হতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সৌদি আরব বর্তমানে ইয়েমেনে ‘একক মালিক’ হিসেবে স্থিতিশীলতা কিনছে। তবে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে এই একক সামরিক কমান্ড নিয়ে বিরোধ রয়েছে। দক্ষিণ ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য গণভোট এবং আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘ পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইয়েমেনে সামরিকায়ন এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। দেশটিতে শান্তিপূর্ণ জীবন কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব, কারণ শিশু ও তরুণরা শিক্ষা ছেড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যোগ দিচ্ছে, যেখানে বেতন তুলনামূলকভাবে বেশি।
সিএ/এমই


