বৃহস্পতি গ্রহকে বলা হয় সৌরজগতের সবচেয়ে বিশাল গ্যাসীয় দানব। এই গ্রহের চারদিকে ঘুরছে চারটি গুরুত্বপূর্ণ উপগ্রহ—আইও, ইউরোপা, গ্যানিমিড ও ক্যালিস্টো। ১৬১০ সালে বিজ্ঞানী গ্যালেলিও গ্যালেলি প্রথম এগুলো আবিষ্কার করেন বলেই এগুলো গ্যালিলিয়ান উপগ্রহ নামে পরিচিত। আকার, গঠন ও পরিবেশগত বৈচিত্র্যের কারণে এই চারটি উপগ্রহ দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
এই চারটির মধ্যে আইও ও ইউরোপা সবচেয়ে বেশি আলোচিত। কারণ এদের স্বভাব একেবারে বিপরীত। আইও হলো সৌরজগতের সবচেয়ে আগ্নেয়গিরিপ্রবণ উপগ্রহ। এর পৃষ্ঠে প্রায় সারাক্ষণই লাভা উদ্গীরণ ঘটে। অন্যদিকে ইউরোপা শান্ত ও শীতল, যার পুরো পৃষ্ঠ বরফে ঢাকা। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই বরফের নিচে বিশাল এক তরল পানির সমুদ্র লুকিয়ে আছে, যেখানে পৃথিবীর সব মহাসাগরের চেয়েও বেশি পানি থাকতে পারে।
একই গ্রহের উপগ্রহ হয়েও কেন এমন বিপরীত বৈশিষ্ট্য তৈরি হলো—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের একদল গবেষক কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে কোটি কোটি বছর আগের বৃহস্পতির পরিবেশ বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, বৃহস্পতি যখন গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল, তখন এটি বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি উত্তপ্ত ও উজ্জ্বল ছিল।
গবেষকদের মতে, আইও জন্ম নিয়েছিল বৃহস্পতির একেবারে কাছাকাছি অঞ্চলে। তখনকার তীব্র তাপে সেখানে পানি জমাট বাঁধার সুযোগই তৈরি হয়নি। ফলে আইও শুরু থেকেই ছিল শুষ্ক, পাথর ও ধাতুসমৃদ্ধ একটি উপগ্রহ। অর্থাৎ আইও কোনো সময় পানি হারায়নি, বরং এটি জন্ম থেকেই পানি-বিহীন ছিল।
অন্যদিকে ইউরোপা বৃহস্পতি থেকে তুলনামূলক নিরাপদ দূরত্বে তৈরি হয়েছিল। এই দূরত্বে তাপমাত্রা এমন ছিল যে বরফ ও পানি টিকে থাকতে পেরেছে। তাই ইউরোপার ভেতরে জন্মকাল থেকেই পানি ও বরফের আধিক্য তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে বিশাল সমুদ্রের রূপ নেয়।
আইও এত উত্তপ্ত আর ইউরোপার বরফের নিচে পানি কীভাবে তরল থাকে—এই দুই প্রশ্নের উত্তরও একই সূত্রে মিলেছে। বৃহস্পতির শক্তিশালী মহাকর্ষ বল আইও ও ইউরোপার ওপর ক্রমাগত প্রভাব ফেলে। এদের কক্ষপথ পুরোপুরি গোল নয়, বরং সামান্য ডিম্বাকৃতির। ফলে কখনো বৃহস্পতির কাছে এলে টান বাড়ে, আবার দূরে গেলে সেই চাপ কমে যায়। এই টানা ও ছাড়ার প্রক্রিয়াকে বলা হয় টাইডাল ফ্লেক্সিং।
এই টানাপোড়েনের কারণে উপগ্রহগুলোর অভ্যন্তরে পাথরের মধ্যে ঘর্ষণ সৃষ্টি হয় এবং তাপ উৎপন্ন হয়। আইও যেহেতু বৃহস্পতির সবচেয়ে কাছে, তাই সেখানে তাপের মাত্রা অত্যন্ত বেশি। ফলে ভেতরের পাথর গলে লাভা হয়ে বেরিয়ে আসে। ইউরোপা তুলনামূলক দূরে থাকায় তাপ কম হলেও তা বরফ গলিয়ে তরল পানি ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট।
গবেষণায় গ্যানিমিড ও ক্যালিস্টোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কারণ এই দুটি উপগ্রহ বৃহস্পতি থেকে অনেক দূরে অবস্থান করায় সেখানে তাপ ও মহাকর্ষীয় প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম। ফলে এরা অধিকাংশ সময় বরফে জমে থাকা শান্ত ও স্থিতিশীল জগত হিসেবে বিবেচিত।
ইউরোপার বরফের নিচে থাকা সম্ভাব্য সমুদ্রে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি না, তা জানার জন্য নাসা ইউরোপা ক্লিপার মিশন পাঠিয়েছে। মহাকাশযানটি ২০৩০ সালের এপ্রিল মাসে ইউরোপার কাছে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এরপর কয়েক বছর ধরে এটি উপগ্রহটির চারপাশে ঘুরে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ চালাবে এবং সেখানে প্রাণবান পরিবেশের সম্ভাবনা অনুসন্ধান করবে।
সিএ/এমআর


