আসন্ন গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে নির্বাচন কমিশন সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
রবিবার (২৫ জানুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন সিইসি। নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে অবহিত করতে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। এতে কূটনৈতিক মিশনসমূহের প্রধান, বাংলাদেশে কর্মরত জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সিইসি বলেন, আসন্ন গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন গণতান্ত্রিক সংহতি জোরদার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনআস্থা সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নির্বাচন প্রক্রিয়াকে স্বাধীন, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য করতে কমিশন সমন্বিত ও বহুমাত্রিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজ করছে।
তিনি জানান, নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আইনগত সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, অংশীজনদের সঙ্গে ধারাবাহিক পরামর্শ এবং কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশব্যাপী ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ৪৫ লাখ নতুন ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন। এর মধ্যে নারী ভোটার প্রায় ২৬ লাখ ৬৫ হাজার। বর্তমানে মোট নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখের বেশি।
সিইসি বলেন, এই ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রমে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা নির্বাচন কমিশনকে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি সহায়তা দিয়েছে, যা কার্যক্রমের সফলতায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
তিনি আরও জানান, নাগরিকদের দাবি, আইনগত নীতি ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের সীমানা পর্যালোচনা করা হয়েছে। যেখানে যৌক্তিকতা পাওয়া গেছে, সেখানে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
পোস্টাল ভোটিং প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, প্রথমবারের মতো বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি ভোটারদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোটদানের সুযোগ চালু করা হয়েছে। এটি আউট অব কান্ট্রি ভোটিং কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি জানান, এ ব্যবস্থায় প্রায় ৮ লাখ প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন করেছেন। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর আওতায় নির্বাচনী এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনি হেফাজতে থাকা নিবন্ধিত ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন।
সিইসি বলেন, নির্বাচনের প্রয়োজনীয় সব উপকরণ প্রস্তুত রয়েছে এবং ব্যালট পেপার মুদ্রণ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। নির্বাচনসংক্রান্ত অভিযোগ ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ভোটদানে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চলমান রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধানসম্মত দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশ সরকার নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ ভোটগ্রহণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে।
নির্বাচন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে কূটনীতিকদের অব্যাহত সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন সিইসি।
ব্রিফিংয়ে নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। মোট প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৯৯৪ জন, এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৫৬ জন।
তিনি আরও জানান, নির্বাচনে ৮১টি দেশি নিবন্ধিত সংস্থার ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া প্রায় ৫০০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক নির্বাচনী কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নির্বাচনে বিভিন্ন বাহিনীর ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৫০ জন সদস্য নিয়োজিত থাকবেন বলে জানান তিনি। পাশাপাশি প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা ৬৯ জন, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ৫৯৮ জন, প্রিজাইডিং অফিসার ৪২ হাজার ৭৭৯ জন, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন এবং পোলিং অফিসার ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৭৬৪ জন। এছাড়া পোস্টাল ভোট পরিচালনায় কমপক্ষে ১৫ হাজার কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন।
পরিসংখ্যান উপস্থাপনের পর কূটনীতিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।
ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, বেগম তাহমিদা আহমদ, মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকারসহ ৪১টি কূটনৈতিক মিশনের প্রধান, বাংলাদেশস্থ জাতিসংঘের ১১টি সংস্থার প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
সিএ/এএ


