চীনের কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তাইওয়ানের নেতৃত্বকে ‘ভেনেজুয়েলা ধাঁচে’ অভিযান চালিয়ে তুলে নেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। এসব মন্তব্যে বলা হচ্ছে, স্বশাসিত দ্বীপটি দখলের আগেই এমন বিশেষ অভিযান চালানো যেতে পারে। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক ও সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) এখনো এ ধরনের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাব্য ‘শীর্ষ নেতৃত্ব নিধন অভিযান’ ঠেকাতে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ও রাডার নেটওয়ার্ক শক্তিশালী, যা যেকোনো আকস্মিক হামলা দ্রুত শনাক্ত করতে সক্ষম। পাশাপাশি সংকটময় পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তাইপের পাশে দাঁড়াতে পারে—এমন ধারণাও কৌশলগত হিসাবে ধরা হচ্ছে।
তাইওয়ান ইতিমধ্যে ‘টি-ডোম’ নামে একটি বহুস্তরভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা ইসরায়েলের ‘আইরন ডোম’-এর আদলে তৈরি। এই ব্যবস্থায় আরও কার্যকর ‘সেন্সর-টু-শুটার’ প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে হামলা প্রতিহত করার সক্ষমতা আরও বাড়ে।
তাইওয়ানের শাসক দল ডেমোক্রেটিক পিপলস পার্টির আইনপ্রণেতা চেন কুয়ান-টিং সতর্ক করে বলেন, চীনের এমন কোনো অভিযান যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে তা দ্রুত পূর্ণমাত্রার সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যার রাজনৈতিক ও সামরিক ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। তিনি বলেন, ‘তাইওয়ানের বহুস্তরভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা এবং প্রাথমিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা যেকোনো ধরনের বিমান হামলা বা বিশেষ অভিযানকে তাইওয়ান প্রণালি অতিক্রম করার সময়েই শনাক্ত করতে সক্ষম। এটা উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেবে।’
বিশ্লেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলা অভিযানের সঙ্গে তুলনা টানছেন, যেখানে নিকোলাস মাদুরোকে তুলনামূলকভাবে নির্বিঘ্নে তুলে নেওয়ার মাধ্যমে মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রদর্শন ঘটে। ওই অভিযানে ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ধ্বংস করে শতাধিক বোমারু, যুদ্ধ ও নজরদারি বিমান মোতায়েন করা হয়। ড্রোন ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কমান্ডারদের তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করা হয়েছিল।
চেন কুয়ান-টিংয়ের মতে, পিএলএর এখনো যৌথ-অভিযানের বাস্তব অভিজ্ঞতা, ইলেকট্রনিক ও ইলেকট্রোম্যাগনেটিক যুদ্ধ সক্ষমতা এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ মিশনের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে তাইওয়ানের মতো প্রস্তুত ভূখণ্ডে এমন অভিযান বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ বিষয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পক্ষ থেকে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিঙ্গাপুরের নিরাপত্তা গবেষক কলিন কোহ মনে করেন, চীনের লক্ষ্য স্পষ্টভাবে তাইওয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও সামরিক প্রস্তুতি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। তিনি বলেন, বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর চেষ্টা চলছে, তবে যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশকে যে সক্ষমতা গড়ে তুলেছে, সেই তুলনায় চীন এখনো অনেক পিছিয়ে।
গত মাসে সামরিক মহড়ার অংশ হিসেবে চীন আবারও তাইওয়ানের দিকে রকেট ছোড়ে। এর জবাবে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বলেন, ‘আমরা তাদের হালকাভাবে নিতে পারি না। তাইওয়ান তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে এবং প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়াতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, পিএলএর আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি থাকলেও কমান্ড কাঠামোর স্বচ্ছতা এবং বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সীমিত। ফলে তাইওয়ানের বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলা ধাঁচের কোনো অভিযান চালাতে গেলে চীনকে বড় মাশুল গুনতে হতে পারে।
সিএ/এসএ


