আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে যুক্ত হওয়া সর্বশেষ ও সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি।
আজকের এআই শুধু হিসাব-নিকাশেই সীমাবদ্ধ নয়— এটি মানুষের মতো চিন্তা করতে পারে, লিখতে পারে, ছবি আঁকে, সুর তোলে, এমনকি গানও গায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে— এআই কি মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী, নাকি মানব মস্তিষ্কের এক শক্তিশালী সহায়ক?
সহজ ভাষায় বললে, এআই হলো মানুষের তৈরি এমন এক বুদ্ধিমান কম্পিউটার প্রোগ্রাম, যা নিজে নিজে শিখতে পারে এবং বিপুল তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম। অনেকেই একে ‘কৃত্রিম মস্তিষ্ক’ বলেও আখ্যা দেন। মানুষ যেভাবে অভিজ্ঞতা থেকে শেখে, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় কিংবা ভাষা ও ছবি চিনতে পারে— এআই মূলত সেই কাজগুলোই যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করে।
এই শেখার প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘মেশিন লার্নিং’। আর যখন এআই মানুষের মস্তিষ্কের মতো জটিল বিষয়— যেমন ভাষা, দর্শন বা উচ্চতর গণিত— বিশ্লেষণ করতে পারে, তখন সেটিকে বলা হয় ‘ডিপ লার্নিং’। আজকের চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা মিডজার্নির মতো প্রযুক্তির পেছনে এই ডিপ লার্নিংই মূল চালিকাশক্তি।
মেশিনও কি চিন্তা করতে পারে?
১৯৫০ সালে ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যালান টুরিং তার প্রবন্ধ Computing Machinery and Intelligence-এ প্রশ্ন তুলেছিলেন— “যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?” এই প্রশ্ন থেকেই আধুনিক এআই গবেষণার ভিত্তি গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথ কলেজে আয়োজিত এক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে প্রথমবারের মতো ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহৃত হয়। সেই সম্মেলনকেই এআই-এর জন্মমুহূর্ত হিসেবে ধরা হয়।
শুরুর দিকে এআই ছিল খুবই সরল— ‘যদি–তবে’ নিয়মে পরিচালিত প্রোগ্রাম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গবেষকরা মানুষের মস্তিষ্কের আদলে নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। এর ফলেই ২০১২ সালে ‘অ্যালেক্সনেট’ নামের একটি মডেল বিপ্লব ঘটায়, যা ছবি ও বস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় আধুনিক ডিপ লার্নিংয়ের যুগ।
কল্পনা থেকে বাস্তব

এআই বাস্তবে আসার বহু আগেই মানুষ সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে এর কল্পনা করেছে। মেরি শেলির ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, কারেল চ্যাপেকের রোসামস ইউনিভার্সাল রোবট কিংবা আধুনিক যুগের দ্য ম্যাট্রিক্স, আই, রোবট— সবখানেই মানুষ ও যন্ত্রের সম্পর্ক, ভয় ও দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে। এসব কল্পকাহিনি আজ বাস্তব প্রযুক্তির সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যাচ্ছে।
সভ্যতার সহায়ক এআই
বাস্তবতায় এআই ইতোমধ্যে মানবজীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি— প্রায় সব ক্ষেত্রেই এআই মানুষের কাজ সহজ করছে। শিক্ষাক্ষেত্রে জটিল বিষয় সহজ করে উপস্থাপন, চিকিৎসায় রোগ নির্ণয় ও জটিল অস্ত্রোপচারে সহায়তা, কৃষিতে সঠিক সময় সেচ ও কীটনাশক ব্যবহারের পূর্বাভাস— সবই এখন এআইয়ের অবদান।
এমনকি সৃজনশীল ক্ষেত্রেও এআই হয়ে উঠছে মানুষের ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’। একটি ধারণা বা স্বপ্নের বর্ণনা দিলেই তা ছবি বা ভিডিওতে রূপ নিতে পারে।
তবে আশঙ্কাও কম নয়
এআই নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ চাকরির বাজার। ব্যাংকিং, হিসাবরক্ষণ, সাংবাদিকতা থেকে শুরু করে সফটওয়্যার উন্নয়ন— বহু ক্ষেত্রে এআই মানুষের কাজ দ্রুত ও কম খরচে করতে পারছে। এতে কর্মসংস্থানের ঝুঁকি বাড়ছে।
এ ছাড়া ভুয়া খবর, কৃত্রিম ছবি ও ভিডিও তৈরির মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানোর আশঙ্কাও রয়েছে। তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রেও এআই এখনও পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠেনি।
আইন ও নৈতিকতার প্রশ্ন
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে এআই নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইউনেস্কো ২০২১ সালে এআই-এর নৈতিক ব্যবহার নিয়ে সুপারিশ দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও ঝুঁকিপূর্ণ এআই ব্যবহারে কঠোর আইন প্রণয়নের পথে এগোচ্ছে।
শেষ প্রশ্ন: এআই বনাম মানুষ?

এআই লিখতে পারে, আঁকতে পারে, গান বানাতে পারে— তাহলে মানুষ আলাদা কোথায়? উত্তর একটাই— অনুভূতি। মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, কষ্ট ও সংগ্রামের ইতিহাসই তাকে অনন্য করে তোলে। এআই তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু অনুভব করতে পারে না।
তাই এআই মানব মস্তিষ্কের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সঠিক ব্যবহারে এটি হতে পারে মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী সহায়ক। প্রযুক্তি নিখুঁত হতে পারে, কিন্তু মানুষ তার চেয়েও গভীর— চিন্তা, অনুভূতি ও সৃজনশীলতায় অনন্য।
সিএ/এসএ


