তুরস্কের উসমানি সুলতানরা একসময় মক্কা, মদিনা, বাগদাদ ও জেরুজালেমসহ দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ, রাশিয়া, পশ্চিম এশিয়া, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করতেন।
সেই বিশাল সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক তোপকাপি প্রাসাদ। মর্মর সাগর, বসফরাস প্রণালি ও গোল্ডেন হর্ন খাঁড়ি বেষ্টিত একটি মনোরম উপদ্বীপের পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত এই প্রাসাদটি আজও উসমানি ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে।
বর্তমান ইস্তাম্বুল শহরের এই উপদ্বীপটি ১৪৫৩ সালের আগে কনস্টান্টিনোপল নামে পরিচিত ছিল এবং এটি ছিল একটি খ্রিষ্টানপ্রধান নগরী। ওই বছর উসমানি সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের নেতৃত্বে শহরটি বিজয়ের পর বাইজেন্টাইন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের ওপর তোপকাপি প্রাসাদের নির্মাণ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী সুলতানরা প্রাসাদের পরিসর ও সৌন্দর্য বাড়ান। তোপকাপি শব্দের অর্থ কামানের গেট; একসময় প্রাসাদের একটি বড় ফটকের নাম থেকেই এই নামকরণ হয়। তুর্কি ভাষায় এটি ‘টপকাপু সারাই’ নামেও পরিচিত।
ওসমানি সাম্রাজ্যের শাসনকাল ছিল প্রায় ৬২৫ বছর। ১৮৫৩ সালে সুলতান আবদুলমেচিদ ইউরোপীয় নকশায় নির্মিত দোলমাবাচে প্রাসাদে বসবাস শুরু করলে তোপকাপির গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমে আসে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ওসমানি রাজবংশের পতনের পর ১৯২৪ সালে আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক তোপকাপি প্রাসাদকে জাদুঘরে রূপান্তর করেন এবং সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।
১৫১৭ সালে আব্বাসীয় খলিফাদের কাছ থেকে মিশর ও আরব ভূখণ্ডের ক্ষমতা সুলতান সেলিমের হাতে আসার পর ইসলামের বহু পবিত্র নিদর্শন তোপকাপি প্রাসাদে সংরক্ষিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে হজরত মোহাম্মদ (স.)-এর পবিত্র দাড়ি, জুব্বা, পাগড়ি, স্যান্ডেল, পানির পাত্র, তরবারি, ধনুক, পতাকা, চিঠি ও পায়ের ছাপসহ তাঁর পরিবার ও সাহাবিদের ব্যবহৃত বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন। এছাড়া এখানে ইব্রাহিম (আ.)-এর ব্যবহৃত পাত্র, ইউসুফ (আ.)-এর পাগড়ি, মুসা (আ.)-এর লাঠি, দাউদ (আ.)-এর তরবারি ও ইয়াহিয়া (আ.)-এর পুথিও সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রাসাদের উত্তর পাশে অবস্থিত সুরক্ষিত ও বিলাসবহুল হারেম ছিল সুলতানের ব্যক্তিগত জীবনের কেন্দ্র। এখানে সুলতানের মা, স্ত্রী, পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রায় ৩০০ উপপত্নী ও দাসী বসবাস করতেন। হারেম শব্দের অর্থ নিষিদ্ধ; সুলতান ও তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠজন ছাড়া অন্য কারও সেখানে প্রবেশাধিকার ছিল না। হারেমের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ছিলেন তুর্কি ও আফ্রিকান খোজা প্রহরীরা।
তোপকাপি প্রাসাদ চারটি প্রধান চত্বর ও হারেমে বিভক্ত। দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে চত্বরগুলোর গুরুত্ব ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পায়। প্রথম চত্বরটি ছিল সবচেয়ে উন্মুক্ত, যেখানে সাধারণ মানুষও প্রবেশ করতে পারত। দ্বিতীয় ও তৃতীয় চত্বর ছিল প্রশাসনিক ও রাজকীয় কার্যক্রমের কেন্দ্র। সবচেয়ে উত্তরের চতুর্থ চত্বর ও হারেম ছিল সবচেয়ে সুরক্ষিত এবং সুলতানের একান্ত ব্যক্তিগত এলাকা। একসময় এই প্রাসাদে চার থেকে পাঁচ হাজার কর্মচারী বসবাস ও কাজ করতেন। প্রাসাদের বিশাল রন্ধনশালায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জন্য খাবার প্রস্তুত করা হতো।
সিএ/এসএ


