ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদে যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। মধ্য লন্ডনে মার্কিন দূতাবাসের দিকে পদযাত্রা করে হাজারো মানুষ হামলা বন্ধের দাবি জানান।
শনিবার বিকেলে ওয়েস্টমিনস্টারের কাছাকাছি মিলব্যাংক এলাকায় বিক্ষোভকারীরা জড়ো হন। পরে ক্যাম্পেইন ফর নিউক্লিয়ার ডিসআর্মামেন্ট (সিএনডি), স্টপ দ্য ওয়ার কোয়ালিশন, প্যালেস্টাইন সলিডারিটি ক্যাম্পেইন, মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন অব ব্রিটেন, প্যালেস্টিনিয়ান ফোরাম ইন ব্রিটেন এবং ফ্রেন্ডস অব আল-আকসা সংগঠনের নেতৃত্বে মার্কিন দূতাবাসের দিকে পদযাত্রা শুরু হয়।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকের হাতে ইরান ও ফিলিস্তিনের পতাকা ছিল। এছাড়া যুদ্ধের প্রথম হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবিও বহন করতে দেখা যায় কিছু বিক্ষোভকারীকে।
বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে বিভিন্ন স্লোগান লেখা ছিল। সেগুলোর মধ্যে ছিল ‘ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধ করো’, ‘ইরানে যুদ্ধ বন্ধ করো’, ‘ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধ করো’ এবং ‘ইরানের ওপর যুদ্ধ নয়’।
লন্ডনের ভক্সহলে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন ‘ইওর পার্টি’র সংসদ সদস্য জারা সুলতানা। তিনি বলেন, ‘আমাদের ফের অবহেলা করা চলবে না।’
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের ইরাক আগ্রাসনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তখন বলা হয়েছিল ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে এবং সেই যুদ্ধ বিশ্বকে নিরাপদ করবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
কভেন্ট্রি সাউথ এলাকার সাবেক লেবার এমপি জারা সুলতানা বলেন, ‘২৩ বছর আগে যখন আমরা ইরাক যুদ্ধের বিরুদ্ধে পদযাত্রা করেছিলাম, তখন আমাদের কথা শোনা হয়নি। আমাদের আর উপেক্ষা করা যাবে না। কারণ, ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে তারা (ইরাক) সঠিক ছিল। আজ আমরা শান্তি, ন্যায়বিচার এবং এমন এক বিশ্বের জন্য আওয়াজ তুলেছি, যেখানে সরকারগুলো অতীত থেকে শিক্ষা নেবে।’
লেবার পার্টির সাবেক নেতা জেরেমি করবিনের এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি। তবে দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে তাঁর একটি লিখিত বিবৃতি পড়ে শোনানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘২০০৩ সালে আমরা লাখ লাখ মানুষ ইরাকে অবৈধ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলাম, কিন্তু আমাদের কথা শোনা হয়নি। তবে আজ আমরা উচ্চস্বরে ও স্পষ্টভাবে বলতে এখানে জড়ো হয়েছি-ব্রিটেনকে যেন আরেকটি অবৈধ যুদ্ধে টেনে নেওয়া না হয়।’
বর্তমানে স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জেরেমি করবিন তাঁর বিবৃতিতে বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন বিপর্যয়কর হস্তক্ষেপে যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে আসছে। আমরা এখানে ভিন্ন কিছু রক্ষা করতে এসেছি। আমরা এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি চাই, যা সহযোগিতা, সমতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চিরকাল ধরে চলা যুদ্ধ কোনো খেলা নয়। বাস্তব জীবনে মানুষের ওপর এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। তাই নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’
এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, শনিবার বিকেলের এই বিক্ষোভে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষ অংশ নেন। কর্মসূচি চলাকালে প্ল্যাকার্ডের মাধ্যমে ‘জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর’ অভিযোগে ষাটোর্ধ্ব এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে লন্ডন পুলিশ।
পরে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে একজনকে অস্ত্র রাখার অভিযোগে এবং আরেকজনকে স্লোগানের মাধ্যমে জাতিগত বিদ্বেষ ছড়িয়ে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে আটক করা হয়। এছাড়া মাইদা ভ্যালে এলাকায় সহিংস বিশৃঙ্খলার সন্দেহে ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিক্ষোভের আগে পুলিশ নিরাপত্তা জোরদার করে এবং কর্মসূচির জন্য নির্ধারিত রুট ও সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়। বিক্ষোভকারীদের বিকেল পাঁচটার মধ্যে সমাবেশ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
পদযাত্রা চলাকালে কিছু লোক ইসরায়েলের পতাকা হাতে মিলব্যাংকের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ তাদের উদ্দেশে ‘খুনি’ বলে স্লোগান দেন। জবাবে পতাকাধারী কয়েকজন বলেন, ‘আপনারা ভুল বলছেন’ এবং ‘আপনারা সত্য অস্বীকার করছেন’।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া লন্ডনে বসবাসরত ৩০ বছর বয়সী ব্রাজিলিয়ান শিক্ষার্থী দানিলা কস্তা বলেন, তিনি শুধু ইরান ও ফিলিস্তিন নয়, কিউবা ও ভেনিজুয়েলার প্রতিও সংহতি জানাতে এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
নর্দাম্পটনের বাসিন্দা ৫৮ বছর বয়সী মার্টিন পেরি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে চালানো সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তিনি জানান, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের কাছে তিনি এই বার্তা দিতে চান যে জনগণ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানোর পক্ষে নয়।
বিক্ষোভের আয়োজকেরা জানিয়েছেন, আগামী ২৮ মার্চ মধ্য লন্ডনে কট্টর ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে আরেকটি পদযাত্রা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
রোববার (৭ ডিসেম্বর) অনুষ্ঠিত এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়া হাজারো মানুষ ইরানে হামলা বন্ধ এবং নতুন কোনো যুদ্ধে যুক্তরাজ্যকে জড়ানো না হওয়ার দাবি জানান।
সিএ/এমই


