বিশ্বের ধনী ও উচ্চ-মধ্যবিত্তদের কাছে গোল্ডেন ভিসা এখন আর শুধু একটি অতিরিক্ত ভিসা নয়; বরং নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করার একটি কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০২৫ সাল সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। কোথাও গোল্ডেন ভিসা কর্মসূচি বন্ধ হয়ে গেছে, কোথাও আইন কঠোর করা হয়েছে, আবার কোথাও নতুন করে সুযোগের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। এসব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ইউরোপসহ বিশ্বজুড়ে গোল্ডেন ভিসা ব্যবস্থায় একটি নতুন রূপান্তর শুরু হয়েছে।
এই পরিবর্তনের বড় প্রভাব পড়তে যাচ্ছে চলতি বছরেই। কোন দেশ বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ২০২৫ সালে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর ওপর। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ ছিল প্রস্তুতির বছর, আর ২০২৬ সাল হতে যাচ্ছে গোল্ডেন ভিসা দুনিয়ার নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
২০২৫ সালে ইউরোপের গোল্ডেন ভিসা বাজারে বড় ধাক্কা আসে স্পেনের সিদ্ধান্তে। দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা কর্মসূচি বন্ধ করে দেয় দেশটি। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি ঘুরে যায় মূলত পর্তুগাল ও গ্রিসের দিকে। বহু বছর ধরেই পর্তুগাল ছিল গোল্ডেন ভিসার শীর্ষ গন্তব্য। আবহাওয়া, ইউরোপজুড়ে ভ্রমণের স্বাধীনতা, শান্ত জীবনযাপন এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল অর্থনীতির কারণে দেশটি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় ছিল। ২০২৫ সালে দ্য ইকোনমিস্ট পর্তুগালকে ইকোনমি অব দ্য ইয়ার ঘোষণা করে।
তবে অক্টোবরে নেওয়া এক সিদ্ধান্ত পর্তুগালে আগ্রহী অনেক বিনিয়োগকারীকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য বসবাসের সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রশাসনিক জটিলতা, ফলে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে এক দশকেরও বেশি সময় লাগতে পারে। এতে অনেকেই বিকল্প গন্তব্যের দিকে নজর দিতে শুরু করেন।
এই প্রেক্ষাপটে নীরবে সামনে চলে আসে গ্রিস। দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, অসংখ্য দ্বীপ, বছরের বেশির ভাগ সময় রোদ এবং তুলনামূলক কম খরচে ভালো জীবনমান গ্রিসকে ভূমধ্যসাগরীয় স্বপ্নের ঠিকানায় পরিণত করেছে। গোল্ডেন ভিসাধারীদের জন্য গ্রিসে নাগরিকত্বের পথও তুলনামূলক সহজ। সেখানে টানা ৭ বছর বসবাস করলেই নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা যায়।
একই সময়ে ইতালি ধীরে কিন্তু স্থিরভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী অনেক মানুষ ইতালির দিকে ঝুঁকছেন। যুক্তরাজ্যের কর ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক পরিবর্তনের ফলে এই প্রবণতা বেড়েছে। ২০১৮ সালে যেখানে ইতালির গোল্ডেন ভিসার আবেদন ছিল মাত্র ৮টি, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সেই সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬৩ শতাংশ।
২০২৫ সালে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে মাল্টা। ওই বছরের মে মাসে ইউরোপীয় আদালত মাল্টার গোল্ডেন পাসপোর্ট কর্মসূচিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। আদালতের মতে, সরাসরি টাকার বিনিময়ে নাগরিকত্ব দেওয়া ইউরোপীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই রায়ের পর গোল্ডেন ভিসা ধারণাটিই নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়ে। সমালোচকদের দাবি, এ ধরনের কর্মসূচি ধনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বৈষম্য বাড়ায় এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করে।
ইউরোপে যখন অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তখন ইউরোপের বাইরে বড় চমক দেখিয়েছে নিউজিল্যান্ড। ২০২৫ সালে দেশটি অভিবাসন বাড়াতে ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। গোল্ডেন ভিসা কর্মসূচি থেকে ইংরেজি ভাষার শর্ত তুলে নেওয়া হয় এবং চালু করা হয় নতুন বিনিয়োগ প্যাকেজ। পাশাপাশি ডিজিটাল নোম্যাডদের জন্যও আলাদা ভিসা চালু করা হয়েছে, যেখানে মাসিক আয়ের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, এ বছর থেকে গোল্ডেন ভিসাধারীরা আবার নিউজিল্যান্ডে বাড়ি কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। নিরাপদ সমাজ, উন্নত জীবনমান ও কর সুবিধার কারণে নিউজিল্যান্ড অনেক মার্কিন নাগরিকের কাছে এখন আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গোল্ডেন ভিসা কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে—এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। সরকারগুলোর কাছে এটি অল্পসংখ্যক মানুষের কাছ থেকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয়ের কার্যকর উপায়। অন্যদিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যসেবার বাড়তি ব্যয় এবং অবসরের পর শান্ত জীবনের আকাঙ্ক্ষা ধনী দেশগুলোর নাগরিকদের দ্বিতীয় দেশের কথা ভাবতে উৎসাহিত করছে।
২০২৫ সালে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে এবং ২০২৬ সালে তা আরও জোরালো হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউরোপের ভেতরে গ্রিস ও ইতালি এবং ইউরোপের বাইরে নিউজিল্যান্ড—এই গন্তব্যগুলোই এখন গোল্ডেন ভিসা বিনিয়োগকারীদের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। গোল্ডেন ভিসা এখন আর কেবল বিলাসিতা নয়; এটি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনমান বেছে নেওয়ার একটি কৌশল হয়ে উঠেছে।
সিএ/এসএ


