পশ্চিমা বিশ্লেষণে ইরানের শাসনব্যবস্থা এখন প্রায় পতনের মুখে—এমন ধারণাই বেশি প্রচলিত।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে ভিন্ন একটি বাস্তবতা সামনে আসে। ইরান আজ না পুরোপুরি স্থিতিশীল, না আবার শাসন পতনের দ্বারপ্রান্তে। এই মধ্যবর্তী অবস্থানই তেহরানকে এনে দিয়েছে এক ধরনের ‘গ্রে সিকিউরিটি জোন’, যা ইসরায়েলের জন্য হয়ে উঠেছে কৌশলগত দুশ্চিন্তার বড় উৎস।
এই ধূসর বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় সুবিধা পাচ্ছে ইরান—সময়। আর সেই সময়ই এখন তেহরানের সবচেয়ে মূল্যবান কৌশলগত সম্পদ।
কেন এই অস্থিরতা ইরানের পক্ষে কাজ করছে
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ (INSS) তাদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে সতর্ক করেছে—ইরান যেন বর্তমান অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ না পায়। ইসরায়েলের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি হলো চুক্তিহীন কূটনৈতিক অচলাবস্থা, যেখানে ইরান আন্তর্জাতিক নজরদারির ফাঁক গলে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন করতে পারে।
কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে দ্বন্দ্ব।
ইসরায়েল যদি সামরিক হামলায় যায়, তাহলে তা অনিচ্ছাকৃতভাবে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে মনোযোগ সরিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার পতাকাতলে জনগণকে একত্রিত করার সুযোগ দিতে পারে। আবার হামলা না করলে, এই বিরতিকে কাজে লাগিয়ে ইরান নিজের সক্ষমতা পুনর্গঠনের সময় পায়।
বিক্ষোভ আছে, কিন্তু পতনের রূপরেখা নেই
ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রাজপথে ক্ষোভ থাকলেও তা এখনো ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বহীন। প্রখ্যাত সামরিক বিশ্লেষক রন বেন ইশাইয়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই আন্দোলন এখনো তাৎক্ষণিকভাবে সরকার উৎখাত করার মতো সংগঠিত শক্তিতে পরিণত হয়নি।
বরং ইতিহাস বলছে, বড় ধরনের বিদেশি হামলা ইরানের মতো রাষ্ট্রে জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দেয়। আট বছরব্যাপী ইরান–ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বহিরাগত আক্রমণ অনেক সময় অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে চাপা দিয়ে শাসনব্যবস্থার পক্ষে জনসমর্থন জোগাড় করে দেয়। দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট সতর্ক করেছে—একটি সামরিক হামলা চলমান বিক্ষোভের গতিপথ পুরোপুরি উল্টে দিতে পারে।
নিষ্ক্রিয়তার ভার কাদের কাঁধে?
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কৌশলী দিকটি হলো—তেহরান কার্যত নিষ্ক্রিয়তার দায় নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে তেল আবিবের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। এক সময় ইসরায়েল ছিল সর্বক্ষণ উদ্যোগী ও আগ্রাসী অবস্থানে। এখন তারা সিদ্ধান্তহীনতার জালে আটকে গেছে।
এই বিভ্রান্তি শুধু ইসরায়েলি হামলা বিলম্বিত করছে না; বরং ইরানের জন্য ভবিষ্যতে পাল্টা বা আগাম পদক্ষেপ নেওয়ার কৌশলগত সুযোগও তৈরি করছে।
‘মোসাদ ষড়যন্ত্র’ বয়ান: দ্বিমুখী কৌশল
ইরানি নেতৃত্ব নিয়মিতভাবে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জন্য মোসাদকে দায়ী করছে। এর মাধ্যমে একদিকে দেশের ভেতরে বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে অকার্যকর করা হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আগাম বা পাল্টা হামলাকে ‘জাতীয় আত্মরক্ষা’ হিসেবে উপস্থাপনের ভিত্তি তৈরি হচ্ছে।
নীরব পুনর্গঠন ও অসম কৌশল
আইএনএসএসের আঞ্চলিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান এখন অসম পুনর্গঠনের কৌশল অনুসরণ করছে। প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো কিছুটা দুর্বল হলেও, তেহরান মনোযোগ দিচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার, পারমাণবিক সীমারেখা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ধরে রাখার দিকে।
কম তীব্রতার বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক নজরদারিকে রাস্তায় ব্যস্ত রাখছে, আর সেই আড়ালে ইরানি প্রকৌশলীরা সরবরাহ লাইন মেরামত, সেন্ট্রিফিউজ উন্নয়ন এবং রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা জোরদার করার কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন—যা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সম্ভব হতো না।
শেষ কথা
তেল আবিব ও ওয়াশিংটনের কৌশলগত নথিগুলো একসঙ্গে পড়লে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এখন ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সমীকরণে সময় তৈরির একটি কার্যকর অস্ত্র।
এই ধূসর বাস্তবতাকে তেহরান শুধু টিকে থাকার জন্য নয়, বরং সংঘাতের মনস্তাত্ত্বিক গতি নিজের পক্ষে ঘুরিয়ে দিতে ব্যবহার করছে। ফলে যুদ্ধ এখন আর অনিবার্য ঘটনা নয়—সম্ভব হলেও ইসরায়েলের জন্য তার ঝুঁকি বেড়ে গেছে বহুগুণ।
সিএ/এসএ


